তফসিল পরবর্তী প্রাণহানি: টিআইবির সঙ্গে সরকারের দ্বিমত

তফসিল পরবর্তী প্রাণহানি: টিআইবির সঙ্গে সরকারের দ্বিমত
ছবি কোলাজ: টাইমস
Advertisement
Advertisement

নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রাণহানির ঘটনায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পরিসংখ্যানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। টিআইবি জানিয়েছে, অফসিল পরবর্তী ৩৬ দিনে ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী নিহত হয়েছেন। তবে এই সংখ্যা ও ঘটনাগুলো অন্ধভাবে মেনে নেওয়ার আগে গভীরভাবে পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে সরকার।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে রোববার এ আহ্বান জানানো হয়।

এতে বলা হয়, পুলিশের নথি অনুযায়ী- টিআইবির উল্লেখিত সময়ের মধ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কেবল পাঁচটি ঘটনা সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত। যার মধ্যে অন্যতম ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদীকে গুলি করে হত্যা। নির্বাচনী প্রচার থেকে ফেরার পথে মোটরসাইকেলে আসা সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে হত্যা করে।

‘প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই নিন্দনীয়, তবে ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ড বিশেষভাবে নৃশংস’ উল্লেখ করে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘এই হত্যার উদ্দেশ্য ছিল একজন তরুণ রাজনৈতিক নেতাকে নীরব করা এবং নির্বাচনের আবহে “সংবেদনশীল রাজনৈতিক সময়ে” ভয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি করা।’

বিশেষ ওই গোষ্ঠীর সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি দাবি করে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দেশ প্রতিশোধমূলক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েনি। নির্বাচনী প্রক্রিয়াও ব্যাহত হয়নি।’

এতে আরও বলা হয়, টিআইবির প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুপস্থিত। তা হলো প্রেক্ষাপট। বাংলাদেশে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সহিংসতা নতুন কোনো ঘটনা নয়।

দেশের নির্বাচনকালীন সহিংসতার অতীত পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ছয়জন নিহত হন। ২০১৮ সালের রাতের নির্বাচনে প্রাণ হারান ২২ জন। আর ২০১৪ সালের প্রকাশ্যভাবে কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১১৫ জনের মৃত্যু হয়।

আরও পড়ুন

এই ইতিহাসের আলোকে বর্তমান নির্বাচন-পূর্ব সময়কে নিরাপত্তার চরম অবনতির উদাহরণ হিসেবে দেখানো কঠিন বলেও মনে করে অন্তর্বর্তী সরকার।

তাদের ভাষায়, টিআইবির পরিসংখ্যান ও সরকারি তথ্যের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা কোনো তথ্য গোপনের ফল নয়। এটি মূলত হত্যাকাণ্ডকে কীভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হবে, সে বিষয়ে মতপার্থক্যের ফল।

টিআইবি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যেকোনো হত্যাকাণ্ডকেই নির্বাচন-সংক্রান্ত বলে গণনা করছে। এতে হত্যার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রমাণ থাকুক বা না থাকুক, তা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।

অন্যদিকে সরকার কেবল সেসব মৃত্যুকেই নির্বাচন-সংক্রান্ত হিসেবে গণ্য করছে, যেগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী কার্যক্রমের সরাসরি ও প্রমাণযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। এই দুই পদ্ধতিকে এক করে দেখা হলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। একই সঙ্গে নিরাপত্তাহীনতার ধারণাও অতিরঞ্জিত হয়।

দেশে জননিরাপত্তা এখনো পুরোপুরি সন্তোষজনক নয় বলেও স্বীকারোক্তি দিয়েছে সরকার। তাদের মতে, শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিকরণ, পুলিশি অপব্যবহার ও নিপীড়নের কারণে জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একটি অন্তর্বর্তী ও অরাজনৈতিক সরকারের দাবি তোলে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষ্যে দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, এরইমধ্যে বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাদের অপসারণ বা বরখাস্ত করা হয়েছে। বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে। গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় ফৌজদারি মামলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সমাবেশ ও নির্বাচনী সময় পুলিশের আচরণ নিয়ন্ত্রণে স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

সম্প্রতি ওসমান হাদীর জানাজা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনের মতো তিনটি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও নজিরবিহীন গণ-অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, এসব আয়োজন প্রমাণ করে, যেখানে আগে সংযম ও পেশাদারিত্বের অভাব ছিল, সেখানে এখন তা সম্ভব হচ্ছে।

‘কোনো সরকারই সহিংসতার সব প্রচেষ্টা পুরোপুরি ঠেকানোর নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বিশেষ করে যখন প্রভাবশালী মহল অস্থিরতা সৃষ্টির আহ্বান জানায়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের মতো নয়’, যোগ করে সরকার।

নিরাপত্তা বাহিনী এখন কঠোর নজরদারির মধ্যে রয়েছে জানিয়ে প্রেস উইং জানায়, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের মধ্যে সহযোগিতা দেখা যাচ্ছে। মাঠে রয়েছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরাও। এসব বাস্তবতার ভিত্তিতে বলা যায়, এই নির্বাচন অতীতের ভয় ও সহিংসতার চক্র ভাঙার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর