বাতাস, পানি ও পরিবেশ দূষণে রাজধানী ঢাকাকে আর মানুষের বসবাসযোগ্য মনে করেন না এলজিআরডি মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এমনকি ইদানীং তিনি নিজেও এই শহরে থাকতে চান না। বরং দেশের অন্য কোনো শান্ত শহরে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে ইচ্ছে করে।
শনিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আয়োজিত ‘দক্ষিণের জানালা’ অনুষ্ঠানের নিজের এই অনুভূতির কথা জানিয়েছেন মির্জা ফখরুল।
অনুষ্ঠানে তিনি ঢাকার কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, রাজধানীতে হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ হচ্ছে। কিন্তু নগরবাসী আসলে তার কতটুকু সুফল পাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
মির্জা ফখরুল বলেন, একটি সত্যিকারের বাসযোগ্য শহর গড়তে হলে শুধু বড় বড় প্রকল্প নিলেই হবে না। বরং সঠিক পরিকল্পনা, কাজের জবাবদিহি এবং কাঠামোগত পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি জরুরি। যেকোনো নতুন কাজের হাত দেওয়ার আগেই এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা উচিত।
নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, ‘আজকাল ঘর থেকে বাইরে পা রাখলেই যে বাতাস আমরা নিচ্ছি, তা বিষাক্ত। সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য কোনো সরকারি হাসপাতালে গেলে সেখানে টেকার উপায় থাকে না। দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যেন ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অচলাবস্থা থেকে বের হয়ে যদি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করা না যায়, তবে সুন্দর ঢাকা গড়ার সব গল্প শুধুই স্বপ্ন রয়ে যাবে। কারণ বিষাক্ত বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নেওয়াই যেখানে অসম্ভব, সেখানে অন্য সব উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়ে।’
মানুষ যেন সুস্থভাবে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারে, সে জন্য বিশুদ্ধ বাতাস নিশ্চিত করার তাগিদ দেন বিএনপি মহাসচিব। একই সঙ্গে তিনি বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার জন্য একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
এলজিআরডি মন্ত্রী বলেন, শুধু সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিলে লাভ হবে না। যারা নীতি তৈরি করছেন, ঢাকা শহর চালাচ্ছেন কিংবা উন্নয়নের পরিকল্পনা করছেন, তাদেরও কাজের সঠিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি স্থানীয় সরকারের একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর সব বড় ও উন্নত শহর নির্বাচিত মেয়র এবং স্বশাসিত করপোরেশনের মাধ্যমেই সুন্দরভাবে চলে। তাই আমাদের দেশের এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও গভীর চিন্তা, দেশপ্রেম আর দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করা দরকার।’
নদীদূষণের কথা বলতে গিয়ে নিজের পুরোনো দিনে ফিরে যান মির্জা ফখরুল। তিনি জানান, কলেজ জীবনে তারা বন্ধুদের নিয়ে বুড়িগঙ্গায় প্রায়ই নৌকায় ঘুরে বেড়াতেন। অথচ আজ দূষণ আর তীব্র দুর্গন্ধের কারণে সেই নদীর ধারে কাছেও যাওয়া যায় না। তার মনে হয়, ঢাকা শহরের অনেক নাগরিক সমস্যার মূলে রয়েছে এই বুড়িগঙ্গার মরণ দশা। বুড়িগঙ্গার পানির পর এখন শীতলক্ষ্যা নদীর পানিও একইভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নদীগুলো এভাবে শেষ হয়ে গেলে ঢাকার মানুষ শেষ পর্যন্ত কোথায় দাঁড়াবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
উন্নয়ন কাজের ধরন নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে ‘প্রকল্প শেষ তো সব শেষ’—এমন একটি মানসিকতা দেখা যায়, যা বন্ধ হওয়া দরকার। ঢাকা শহরের পানির সংকট নিয়ে সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকেও কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকার পানির অবস্থা এখন খুবই বিপজ্জনক। শহরের একটা বড় অংশের পানি পানের একদম অযোগ্য। এর ওপর মাটির নিচের পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে, যা পুরো ঢাকার জন্য এক মস্ত বড় বিপদ সংকেত।
সবশেষে মির্জা ফখরুল নদীগুলোকে বাঁচানোর জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশে কত রকমের বড় বড় প্রকল্প পাস হয়, অথচ বুড়িগঙ্গার দূষণ দূর করার জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না। তবে তিনি আশ্বস্ত করেন, আগামীতে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীকে কীভাবে দূষণমুক্ত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়, তা নিয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের সাথে কার্যকর আলোচনা করবেন।


