কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌরসভায় ড্রেন নির্মাণের জন্য প্রায় এক বছর আগে করা হয় খনন। তবে এরপর আর হয়নি কাজ। সেখানে জমে থাকা পানিতে পড়ে প্রাণ হারাল মো. ইফাত (৬) নামে এক শিশু।
সোমবার বিকালে পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের এলংগী এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ইফাত স্থানীয় লুঙ্গি ব্যবসায়ী কামরুল হাসানের ছেলে এবং বায়তুল উলুম ইসলামিয়া ক্যাডেট মাদ্রাসার প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিল।
এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আদরের সন্তান হারিয়ে মা শারমিন আক্তার আহাজারিতে ভেঙে পড়েছেন। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন শিশুটির বাবাও। তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
স্বজন ও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক বছর আগে ড্রেন নির্মাণের জন্য খনন করা হলেও এখনো কাজ শুরু হয়নি। খনন করা অংশে পানি জমে মৃত্যকূপে পরিণত হয়েছে। ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। দোষীদের শাস্তির দাবি জানান তারা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুমারখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ব্যাংক কর্মকর্তা মানিক শেখের বাড়ি থেকে গড়াই নদী পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার ড্রেনেজ প্রকল্প হাতে নেয় পৌর কর্তৃপক্ষ। গত বর্ষা মৌসুমে ড্রেন নির্মাণের উদ্দেশ্যে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে সরু খাল সৃষ্টি করে ঠিকাদার। তবে এক বছরেরও নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় মানিকের বাড়ির সামনে ছোট খাদে পরিণত হয়েছে।
আরও জানা গেছে, সোমবার বেলা ৩টার দিকে শিশু ইফাত ও তার চাচাতো ভাই সামাদ (১১) ছাগল চরানোর জন্য বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর ঘণ্টাখানেক পরে সামাদ বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু রিফাত বাড়ি না ফেরায় স্বজনরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে বিকাল ৪টার দিকে মানিকের বাড়ির সামনের নির্মাণাধীন ড্রেন থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। এরপর তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, শিশু ইফাতের বাড়িতে মাতম চলছে। স্বজন ও প্রতিবেশীরা ছুটে এসেছেন শেষবারের মতো দেখতে। সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ তার মা আহাজারি করছেন। তাকে শান্ত্বনা দিচ্ছেন স্বজনরা।
এ সময় বিলাপ করতে করতে ইফাতের মা শারমিন আক্তার বলেন, ‘ওরে বুকে ধরি কি শান্তি, বুকি ধরবরে! ওহ আমার কোলে দেন, বুকি ধরবরে, বুকে ধরে কি শান্তি! আমি ওরে দেখে রাখতি পারি নাই।’
চাচা সামছুল আলম অভিযোগ করে বলেন, ‘এক বছর আগে ড্রেনের জন্য খাল কাটে ঠিকাদার। কিন্তু এতদিনেও কাজ শেষ হয়নি। সেখানে মানুষ সমান পানি জমে আছে। পানিতে পড়ে আমার ভাতিজার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর জন্য ঠিকাদার দায়ী। আমরা এর বিচার চাই।’
শিশুটির মামা স্বাধীন হোসেন বলেন, ‘নির্মাণাধীন ড্রেনে স্যান্ডেল দেখে ইফাতকে শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন।’ তার ভাষ্য, সময় মতো ড্রেনের কাজ শেষ হলে এমনটা হতো না।
তাৎক্ষণিকভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও কাজের বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে লিটন আলী নামে এক ঠিকাদার কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে ঠিকাদার লিটন আলী প্রথমে বলেন, এলংগী এলাকায় ড্রেনেজ কাজ চলছে তার। কাগজপত্রাদি দেখে বিস্তারিত বলা যাবে। পরে শিশুটির মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে লিটন বলেন, তিনি কিছুই জানেন না। বাইরে গাড়িতে আছেন। পরে কথা বলবেন বলে ফোনটি কেটে দেন।
এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে ইউএনও ও পৌরসভার প্রশাসক ফারজানা আখতার বলেন, ঠিকাদারের অবহেলা আছে কি না, তা ক্ষতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, নির্মাণাধীন ড্রেনে জমে থাকা পানিতে ডুবে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


