চলমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালটি ন্যাটোর (উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট) জন্য এক অগ্নিপরীক্ষার বছর হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিধ্বস্ত ও ক্লান্ত ইউরোপকে সোভিয়েত ইউনিয়নের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে ১৯৪৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে জোটের জন্ম হয়েছিল, আজ তার অস্তিত্বই সংকটের মুখে। তবে এবারের হুমকি বাইরের কোনো শক্তি নয়, বরং জোটের প্রধান কারিগর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি ও উচ্চাভিলাষ থেকেই উদ্ভূত। ‘ডেনমার্ক বনাম যুক্তরাষ্ট্র’— গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই নজিরবিহীন টানাপোড়েন ন্যাটোর কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিতে পারে কি না, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ন্যাটো কেবল একটি সামরিক জোট নয়; এটি পশ্চিমা পুঁজিবাদী ধারণা বিস্তার এবং বিশ্বজুড়ে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। সুদীর্ঘ পথচলায় নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমানে এই জোটের সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২-এ। এমনকি দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতার নীতি বিসর্জন দিয়ে ২০২৪ সালের মার্চে সুইডেনও এই জোটে শামিল হয়েছে। কিন্তু সম্প্রসারণের এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ফাটল। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কড়া আপত্তির মুখে ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ লাভের আকাঙ্ক্ষা এখন বিশবাঁও জলে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে যে আলোচনার সূত্রপাত করেছেন, সেখানে তিনি ইউরোপীয় মিত্র দেশ কিংবা ন্যাটোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে চলেছেন। পুতিনের দেওয়া অন্যতম শর্ত – ইউক্রেন কখনো ন্যাটোর অংশ হতে পারবে না – তা মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত ট্রাম্পের পক্ষ থেকে আসায় জোটের সংহতি আজ বড় প্রশ্নের মুখে।
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড। আয়তনে জার্মানির চেয়ে ছয় গুণ বড় এই দ্বীপটি খনিজ সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে আর্কটিক অঞ্চলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ডেনমার্কের একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড। ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ডেনমার্কের এই অবিচ্ছেদ্য অংশটি নিজের দখলে নিতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি মনে করেন, মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড অপরিহার্য। কিন্তু একটি মিত্র দেশের ভূখণ্ড ‘দখল’ করার এই মানসিকতা ন্যাটোর মূল স্তম্ভ ‘আর্টিকেল ৫’-এর ধারণাকেই ধ্বংস করে দেয়। ন্যাটোর বিধান অনুযায়ী, এক সদস্যের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপর আক্রমণ। এখন ট্রাম্প যদি গ্রিনল্যান্ড পাওয়ার জন্য ডেনমার্কের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন বা কোনো ধরনের বৈরী পদক্ষেপ নেন, তবে সেটি হবে জোটের ওপর সরাসরি আঘাত। এটি এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যা আগে কখনো কল্পনাও করা যায়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ব্রাসেলসে গিয়ে ন্যাটোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অটুট সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করলেও ইউরোপীয় দেশগুলো আশ্বস্ত হতে পারছে না। ট্রাম্পের স্পষ্ট দাবি – ন্যাটোতে থাকতে হলে সদস্য দেশগুলোকে তাদের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্বিগুণ করতে হবে। ইতিপূর্বে জিডিপির ২ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এখন ট্রাম্পের চাহিদা তার চেয়েও বেশি। ন্যাটোর অংশীজনরা নিজেদের সামরিক ব্যয় না বাড়ালে ট্রাম্প জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার যে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন, তা ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে ভঙ্গুর করে দিচ্ছে।
সম্প্রতি প্যারিসে তথাকথিত ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা নব্বই শতাংশ এগিয়ে যাওয়ার দাবি করেছেন জেলেনস্কি। এই শান্তি প্রক্রিয়ায় আমেরিকাকে পাশে রাখা ইউক্রেন ও ইউরোপীয় নেতাদের জন্য এতটাই জরুরি যে, তারা গ্রিনল্যান্ড ইস্যুর মতো বড় বিবাদকেও টেবিলের বাইরে রাখছেন। প্যারিসের জমকালো বৈঠকে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যে অস্বস্তি ছিল, তা এক ‘অস্বীকার করা যায় না এমন সমস্যা’ হওয়া সত্ত্বেও কৌশলগত কারণে উপেক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতদিন এই উপেক্ষা বজায় রাখা সম্ভব?
ন্যাটো এখন এক দোলাচলের মধ্যে। একদিকে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকি, অন্যদিকে খোদ জোটের নেতৃত্বের পক্ষ থেকে আসা অবাস্তব শর্ত ও আঞ্চলিক দাবি। ট্রাম্পের কাছে ন্যাটো এখন অনেকটা ‘সুরক্ষা বাণিজ্যের’ মতো, যেখানে স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটলে তিনি জোট ত্যাগে দ্বিধা করবেন না। গ্রিনল্যান্ড দখল বা কেনার যে জেদ ট্রাম্প ধরেছেন, তা যদি বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে, তবে ডেনমার্কসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন কখনোই তা মেনে নেবে না।
উপসংহারে বলা যায়, ন্যাটোর মৃত্যু হয়তো যুদ্ধের ময়দানে হবে না, বরং এর পতন ঘটতে পারে অভ্যন্তরীণ অবিশ্বাসের কারণে। গ্রিনল্যান্ডের বরফ নয়, বরং আটলান্টিকের দুই পারের সম্পর্কের বরফ গলাতে না পারলে ১৯৪৯ সালে শুরু হওয়া এই ঐতিহাসিক পথচলা ২০২৬-এর উত্তাল ভূ-রাজনীতিতে হারিয়ে যেতে পারে। ন্যাটোর অস্তিত্ব রক্ষা এখন আর কেবল সদস্যপদ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য বনাম মিত্রদের সার্বভৌমত্বের মধ্যকার ভারসাম্যের ওপর।
লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ও পরিচালক, হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-বাংলাদেশ সেন্টার, [email protected]


