নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর পর থেকে সংকট যেন পিছু ছাড়ছে না বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের। অর্থনৈতিক মন্দা তো ছিলই, চলতি বছরের মাঝামাঝিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির ধকলও সইতে হয়েছে দেশের অর্থনীতির ‘চালিকাশক্তি’ হিসেবে পরিচিত পোশাক খাতকে।
এরই মধ্যে কারখানা মালিকদের মতামত উপেক্ষা করে শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনের শর্ত শিথিলের প্রস্তাব, একের পর এক আগুনের ঘটনা এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছ থেকে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার ধাক্কায় খাতটিকে নতুন সংকটের মধ্যে ফেলেছে।
প্রস্তাবিত শ্রম আইন অনুযায়ী, অন্তত ২০ জন শ্রমিক থাকলেই কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা যাবে। যেখানে বর্তমানে একটি কারখানায় কর্মরত কমপক্ষে ২০ শতাংশ শ্রমিকের অংশগ্রহণে ইউনিয়ন হয়।
একটি কারখানায় ইউনিয়নের সর্বোচ্চ সংখ্যা তিনটি থেকে বাড়িয়ে পাঁচটি করার প্রস্তাবও উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদন হয়েছে।
রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, খুব কম সংখ্যক শ্রমিক দিয়ে পাঁচটি ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ কারখানায় জটিলতা ও অস্থিরতা বাড়াবে। এজন্য ফিলিপাইনের উদাহরণও টানছেন তারা।
অন্তর্বর্তী সরকার গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে। যা গেজেট প্রকাশের পর কার্যকর হবে। এই আইন কার্যকর হলে পোশাক খাত অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
শাশা ডেনিমস লিমিটেড ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, ‘প্রস্তাবিত আইনটি বাস্তবায়ন হলে পোশাক শিল্প অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।’
তিনি বলেন, ‘১৯৮০–এর দশকের শুরুতে ফিলিপাইন এশিয়ার শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারকদের একটি ছিল। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত শ্রমিক ইউনিয়নের কারণে দেশটির রপ্তানি প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে ৬০০–৭০০ মিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে।’
বিকেএমইএ সভাপতি ও এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘পোশাক খাতে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪২৪ টি ট্রেড ইউনিয়ন হয়েছে এবং এর মধ্যে ৯০৫টির ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।’
‘এ বাস্তবতা বলে দেয় বাংলাদেশে এখনো ইউনিয়ন গঠনের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি।’
আইএলও বা ইইউ কেউ সরকারকে ‘যথেচ্ছ স্বাধীনতা’ দিতে বলেনি মন্তব্য করে হাতেম বলেন, ‘তাদের নাম ভাঙ্গিয়ে যে মহল অতিরিক্ত ইউনিয়ন গঠনের পরামর্শ দিয়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে তাদের গোঁড়া খুঁজে বের করতে হবে। আমরা আশঙ্কা করছি তারা অন্য কোনো দেশের এজেন্ডা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিকে টার্গেট করেছে।’
নারায়ণগঞ্জের আরএস কম্পোজিটে ভুয়া শ্রমিক নিয়ে ইউনিয়ন নিবন্ধনের ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যাচাই–বাছাই ছাড়াই শ্রম মন্ত্রণালয় নিবন্ধন দেয়, পরে মালিক চ্যালেঞ্জ করলে তা বাতিল হয়, যা “সরকারের দায়িত্বশীলতার ঘাটতির” দৃষ্টান্ত।’

পাঁচটি ইউনিয়ন যদি বছরের ভিন্ন সময়ে আলাদা আলাদা দাবি তুলে কাজ বন্ধ রাখে তাহলে কারখানা কীভাবে চলবে এবং মালিকপক্ষকে কে সুরক্ষা দেবে; সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
এ অবস্থায় রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনামের উদাহরণ টানছেন। তারা বলছেন, ভিয়েতনামে ১০ জন শ্রমিক মিলেও ইউনিয়ন করা যায়। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র–নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় ফেডারেশনের অধীনে থেকেই মূল সিদ্ধান্ত আসে এবং সেই ফেডারেশনও সরকারের নীতির বাইরে যায় না।
ভিয়েতনাম জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবারই (ভিজিসিএল) দীর্ঘদিন দেশটিতে একমাত্র অনুমোদিত জাতীয় ফেডারেশন ছিল জানিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, সেখানে বিকল্প ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ ছিল না। তবে গত জুলাইয়ে ভিয়েতনামে নতুন ট্রেড ইউনিয়ন আইন কার্যকর হওয়ার পর ইউনিয়ন গঠনে কিছু স্বাধীনতা এলেও সেখানে সরকারি নিয়ন্ত্রণ এখনো স্পষ্ট।
ভিয়েতনামের পোশাকশিল্পে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রাধান্য থাকায় বিনিয়োগকারীরা ‘নিরাপদ পরিবেশ’ বা ‘লো-ইউনিয়ন রিস্ক জোন’ চান। শ্রমিকরাও অনেক সময় ইউনিয়নে গেলে ‘সমস্যাযুক্ত কর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়েও নিরুৎসাহিত হন।
পোশাক খাতের মালিক ও এই খাত নিয়ে কাজ করা পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকারের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই ‘অসুস্থ’ অবস্থায় রয়েছে।
বিজিএমইএ’র কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানালেন, নতুন প্রস্তাবিত আইনটি নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা।
বিজিএমইএ মিডিয়া উইংয়ের চেয়ারম্যান মাসুদ কবির বলেন, ‘ধরুন, শ্রমিকদের পাঁচটি গ্রুপ পাঁচটি রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে আঁতাত করে ভিন্ন ভিন্ন কর্মসূচি দিল, তখন কোন মালিক নির্বিঘ্নে কারখানা চালাতে পারবে?’
‘এমনিতেই বাংলাদেশের কারখানা মালিকরা প্রতিযোগীদের তুলনায় ব্যবসার বাইরের অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে অতিরিক্ত চাপ সামলান। তখন তাদের নতুন চাপের মধ্যে থাকতে হবে।’
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্যের বড় কারণ হিসেবে দেখা হয় তুলনামূলক সস্তা শ্রমকে। এই খাতে ৪০ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরও শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি ও জীবনমান নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, ‘জেনুইন ট্রেড ইউনিয়ন করা অনেক কঠিন ছিল বলেই আমরা ন্যূনতম ২০ জন শ্রমিক নিয়ে গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলাম এবং সরকার তা মেনে নিয়েছে।’
ভুয়া শ্রমিক দিয়ে ইউনিয়ন গঠনের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন কাজ করিনি। কেউ করলে তাদের সনাক্ত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।’
কিছু ক্ষেত্রে মালিকরা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজস করে ইউনিয়ন বাতিল করিয়েছে, এমন পাল্টা অভিযোগও তোলেন তিনি।

অন্যদিকে রপ্তানিকারকরা বলছেন, বহিরাগত বা অস্থায়ী শ্রমিকদের দিয়ে ইউনিয়ন গঠনের চাপ তৈরি হচ্ছে যা কৃত্রিম শ্রম অস্থিরতার ইন্ধন হিসেবে কাজ করছে এবং এতে মালিকদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
গাজীপুরের গ্রিনটেক ফ্যাশনসের উদ্যোক্তা শোভন ইসলাম বলেন, ‘অন্য সব পেশার মানুষের মতো শ্রমিকের জীবনমান ও অধিকার নিয়ে আরো কাজ হওয়া দরকার। কিন্তু কোনোভাবেই খাতের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে নয়।’
এই খাতে বাংলাদেশের যে অর্জনগুলো হয়েছে তা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উদাহর টেনে শোভন ইসলাম বলেন, ‘আইএলও “বেটার ওয়ার্কস” কর্মসূচির অধীনে পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি কারখানার শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যে কীভাবে তারা ফ্লোর থেকেই আন্তর্জাতিক হটলাইনে কল করে আইএলও–কে তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানাতে পারে। একটি অভিযোগ পাওয়া মাত্রই প্রধান আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয় এবং তদন্ত বা নিষ্পত্তির আগেই মালিক বিপাকে পড়েন, এমন মডেলে বিশ্বের অন্য দেশগুলো পোশাক কারখানা কখনো চালায় না।’
গ্রিনটেক এক বছর ধরে উৎপাদনে আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জীবনে এ কারখানায় কাজ করেনি এমন লোকজনকে নিয়ে সেখানেও একটি ইউনিয়ন গঠন হয় এবং শ্রম অধিদপ্তর সেটিকে ছাড়পত্র দেয়।’
‘বিষয়টি নিয়ে সরকারি দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে এবং এমন বেশ কিছু ঘটনার বিষয়ে উদ্যোক্তারা প্রতিবাদ করতে শুরু করেছেন।’
শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক (ট্রেড ইউনিয়ন) এসএম এনামুল হক বলেন, ‘ইউনিয়ন গঠনে মালিকের অনুমতি লাগে না, শ্রমিকরা আবেদন করলে যাচাই–বাছাই শেষে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।’
তার ভাষায়, এই প্রস্তাবের আগে শ্রম মন্ত্রণালয়, মালিক ও শ্রমিক পক্ষ নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মালিকরা আপত্তি না করায় প্রস্তাবটি গৃহীত হয়েছে, আইনটি কেবিনেটে পাস হয়েছে এবং এখন গেজেট প্রকাশের অপেক্ষায় আছে।
তিনি বলেন, ‘এখানে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আর কিছু করার নেই।’
গাজীপুরের বাসন সড়ক ও চৌরাস্তা এলাকার কিছু কারখানায় নিয়ম না মেনে ভুয়া আইডি কার্ডধারী শ্রমিকদের দিয়ে ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে এবং এসব শ্রমিক অস্থিরতা তৈরি করছে বলে অভিযোগ পোশাক শিল্প মালিকদের।
তাদের দাবি, এ ধরনের ঘটনায় গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ার বেশ কিছু কারখানায় গত কয়েক দিনে ভাঙচুর হয়েছে।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিক অসন্তোষ ও অন্যান্য কারণে গত এক বছরে সারাদেশে ৩০৪টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও কিছু ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।
শোভন ইসলাম বলেন, ‘আমরা ব্যবসা করতে চাই, এজন্য সুস্থ–স্বাভাবিক ও আতঙ্কমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন, কৃত্রিমভাবে ব্যবসা–পরিবেশ বিনষ্ট করা হলে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়বে।’
তার মতে, রপ্তানি খাতে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের অবশ্যই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা উচিত।
শ্রমিকদের অগ্রহণযোগ্য আচরণের কারণে প্যাসিফিক জিন্সের মতো স্বনামধন্য গ্রুপের সাতটি কারখানা এক সপ্তাহ বন্ধ রাখার ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এটি খাতের জন্য অশনি সংকেত’।
প্যাসিফিক জিন্স ইউনিক্লো, জেক্র, এইচ অ্যান্ড এম ও জারার মতো ক্রেতাদের জন্য পণ্য তৈরি করে।
প্যাসিফিক জিন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, ‘১৪ অক্টোবর কিছু শ্রমিক কাজ বন্ধ করে উচ্ছৃঙ্খলতা সৃষ্টি করে, বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং জোর করে সবাইকে বেআইনিভাবে কর্মবিরতিতে বাধ্য করে, ফলে কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে পরস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় এক সপ্তাহ বন্ধের পর গত বৃহস্পতিবার কারখানাগুলো আবার চালু হয়েছে।’
এ সব অস্থিরতা এমন সময়ে দানা বাঁধছে যখন চট্টগ্রাম বন্দরে বাড়তি শুল্ক, বিভিন্ন কারখানায় অগ্নিকাণ্ড এবং বৈশ্বিক ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার চাপ গ্যাস সংকট, উচ্চ সুদ ও ব্যাংকে তারল্য সংকটের মতো পুরনো সমস্যারই সমাধান হয়নি। ফলে নতুন-পুরোনো সংকট মিলে পোশাক খাতকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ট্রাম্পের শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রমুখী শিপমেন্ট হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি প্রায় ২৫ শতাংশ বাড়লেও পরের দুই মাসে তা টানা কমেছে। যা আগের মাসের তুলনায় এবং ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় বেশ কম।
বিজিএমইএ’র সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান জানান, জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে এ খাতে নতুন ক্রয়াদেশ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০–১৫ শতাংশ কমে গেছে।
এ অবস্থায় পোশাক খাত ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে নতুন করে সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।


