যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দিচ্ছে সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসরসহ আরও সাত দেশ। স্থায়ীভাবে গাজা যুদ্ধ বন্ধ ও ফিলিস্তিন পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেনা ও শীর্ষ কর্মকর্তারাদের নিয়ে এই বোর্ড গঠন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বোর্ডে যোগ দেওয়া নতুন দেশগুলো হলো- সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও কাতার। বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে তারা জানায়, গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, পুনর্গঠন সহায়তা এবং ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তারা এই ‘শান্তি উদ্যোগে’ অংশ নিচ্ছে।
এর আগে ইসরায়েলও প্রকাশ্যে বোর্ডে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এরইমধ্যে বোর্ড অব পিসের অংশ হয়েছে- সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, আলবেনিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, হাঙ্গেরি, কাজাখস্তান, মরক্কো ও ভিয়েতনাম।
এখন পর্যন্ত ঠিক কতটি দেশকে এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে রাশিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ভ্যাটিকানের পোপ লিও বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন। অবশ্য তাদের পক্ষ থেকে কেউই এখনও বোর্ডে যোগ দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেনি।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকের ফাঁকে ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বোর্ড অব পিসে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। তবে এর পরপরই পুতিনের পক্ষ থেকে ভিন্ন বার্তা আসে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, রুশ প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন ট্রাম্পের আমন্ত্রণটি এখনও বিবেচনাধীন রয়েছে এবং বোর্ডটির কার্যক্রম তিনি মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক বলেই দেখছেন। পুতিন জানান, ফিলিস্তিন পুনর্গঠনে ‘জব্দ করা রুশ সম্পদ’ থেকে এক বিলিয়ন ডলার দিতে মস্কোর কোনো আপত্তি নেই।

অন্যদিকে ট্রাম্পের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট গোলব। তার মতে, এই বোর্ড আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভারসাম্যে বিপজ্জনক হস্তক্ষেপ করতে পারে। এমনকি ট্রাম্পের প্রভাবে এই বোর্ড ভবিষ্যতে জাতিসংঘের মতো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সংস্থাকেও প্রতিস্থাপন করতে পারে বলে শঙ্কা জানান তিনি।
সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এক নথিতে বলা হয়, কেবল তিনটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সনদে সম্মতি দিলেই ‘বোর্ড অব পিস’ কার্যকর হবে। সদস্য দেশগুলোর মেয়াদ হবে তিন বছর। তবে সদস্যপদগুলো নবায়নযোগ্য।
বোর্ডকে এক বিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তা দিলেই স্থায়ী আসনের সুযোগ থাকবে। সনদ অনুযায়ী, বোর্ডটির চেয়ারম্যান থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধির ভূমিকা পালন করবেন এবং তিনিই নির্বাহী বোর্ডের সদস্য নিয়োগসহ সহযোগী সংস্থা গঠন বা বিলুপ্ত করার ক্ষমতা রাখবেন।
গত শুক্রবার হোয়াইট হাউস বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী বোর্ডের সাত সদস্যের নাম ঘোষণা করে। তাদের মধ্যে রয়েছেন- যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।
শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, এই বোর্ড মূলত গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসান এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন তদারকির জন্য গঠিত হচ্ছে। তবে প্রস্তাবিত সনদে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের কথা সরাসরি উল্লেখ নেই। বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় যুদ্ধ বিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রভাব বিস্তার করা একটি সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।
এই সংস্থা জাতিসংঘ বা জাতিসংঘের কিছু কার্যক্রমের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে বলেও উদ্বেগ জানিয়েছে কূটনৈতিক মহল। এ শঙ্কা কাটাতে বোর্ড অব পিস পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে গাজায় বোর্ডের প্রতিনিধি হিসেবে সাবেক জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্য দূত নিকোলাই ম্লাদেনভকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই ধাপেই গাজার পুনর্গঠন ও নিরস্ত্রীকরণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শুধু তাই নয়, বোর্ডটি ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের আওতায় কাজ করবে বলেও নিশ্চিত করেছে হোয়াইট হাউস।
অবশ্য এই কাঠামো নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় দাবি করে, ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সমন্বয় ছাড়াই গাজার নির্বাহী বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং এটি দেশটির মূলনীতির পরিপন্থী।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়, বোর্ডে তুরস্ক ও কাতারের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্তও ইসরায়েলের মতামত উপেক্ষা করে নেওয়া হয়েছে।
গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে রাজি হয় ইসরায়েল ও হামাস। এর আওতায় গাজায় আটক জীবিত ও মৃত ইসরায়েলি জিম্মিদের বিনিময়ে ইসরায়েলি কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের আংশিক প্রত্যাহার এবং উপত্যকায় মানবিক সহায়তা সরবরাহ বাড়ানো হয়।
তবে কোনো পক্ষই চূড়ান্তভাবে চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে সায় না দেওয়ায় এখনও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। কাজেই যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরায়েল-হামাস সহিংসতা অব্যাহত আছে।
হামাস পরিচালিত ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত ৪৬০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের হামলায় ইসরায়েলের তিন সেনা নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস সদস্যরা দক্ষিণ ইসরায়েলে অতর্কিতে হামলা চালালে এই যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় ইসরায়লের প্রায় এক হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে নেওয়া হয়। হামলার জবাবে ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজা কর্তৃপক্ষের হিসাবে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭১ হাজার ৫৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।


