মাথায় হ্যাট পরা নায়ক রাজ রাজ্জাকের একটি ছবি সামাজিকমাধ্যমে অনেককে শেয়ার করতে দেখা যায়। আকর্ষণীয় লুকে তাকিয়ে থাকা রাজ্জাকের সেই ছবিটি কোন চলচ্চিত্রের—জিজ্ঞেস করলে অধিকাংশ মানুষই বলতে পারবেন না। এটি সিবি জামান পরিচালিত ‘ঝড়ের পাখি’ ছবির একটি স্থিরচিত্র, যা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৩ সালের ৩ মার্চ। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম ক্লাসিক এই ছবিটি পরিচালকের নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র।
এ ছবির চিত্রনাট্য, সংলাপ এবং প্রযোজনা করেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি খান আতাউর রহমান। চলচ্চিত্র গবেষক মীর মীর শামসুল আলম বাবু জানান, সিবি জামান প্রথমে ছবিটি পরিচালনা করতে চাননি। খান আতা তাকেই পরিচালনার জন্য উৎসাহ দেন। এরপর তিনি রাজি হন। বাকিটা ইতিহাস।
রাজ্জাক ও শাবানার পাশাপাশি ছবিটিতে আরও অনেক খ্যাতিমান শিল্পী অভিনয় করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন খান আতা, মিনু রহমান, কায়েস, আয়শা আক্তার, সাজ্জাদ, খলিল, খান জয়নুল, ইনাম আহমেদ, দারাশিকো এবং মরহুম রাজু আহমেদ। অভিনেত্রী আনোয়ারার ছোট বোন নার্গিসও এ ছবিতে অভিনয় করেন—এটাই ছিল তার প্রথম চলচ্চিত্র। ছবিটির শিল্প নির্দেশনায় ছিলেন আব্দুস সবুর, চিত্রগ্রহণে খান আরিফুর রহমান এবং সম্পাদনায় আবু তালেব।
ছবিতে সেলিম চরিত্রে অভিনয় করেন রাজ্জাক। পেশায় তিনি একজন ব্যাংকার। অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতোই চলছিল তার জীবন। কিন্তু হঠাৎ একদিন সেই জীবনে নেমে আসে ঝড়। তার বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে টাকা চুরি এবং এক কর্মকর্তাকে খুনের অভিযোগ ওঠে। সব সাক্ষ্য-প্রমাণও তার বিরুদ্ধেই যায়। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে গিয়ে সে পালিয়ে বেড়ায়—এভাবেই হয়ে ওঠে ‘ঝড়ের পাখি’। বিপদের সময় তার পাশে দাঁড়ায় বন্ধু মামুন। তার সহায়তায় সেলিম ছদ্মবেশে আশ্রয় নেয় এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের বাসায়। এদিকে তার সবচেয়ে কাছের মানুষ গফুর সাহেব অজ্ঞাত কারণে স্ট্রোক করে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। মা এক মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করেছিলেন, কিন্তু এরই মধ্যে সে বিচারকের মেয়ের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। পুলিশকে পেছনে রেখে নানা ঝড়ঝাপটা পার করে শেষ পর্যন্ত নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে সেলিম। এই উত্থান-পতনের গল্পই ‘ঝড়ের পাখি’।
সিবি জামানের ছেলে সিএফ জামান বাবার মুখে শোনা শুটিংয়ের একটি ঘটনা শোনান, “ছবির টাইটেল সিকোয়েন্স শুটের সময় আব্বুর নির্দেশে রাজ্জাক আংকেল ফার্মগেট থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটেছিলেন। ক্যামেরার সামনে তার এই হাঁটা ছিল বিনা প্রশ্নে। কারওয়ান বাজারের কাছাকাছি এসে রাজ্জাক আংকেল শুধু হাত মুখের কাছে নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আর কতক্ষণ, জামান ভাই?’ উত্তরে সামনে চলমান গাড়ির পেছনে ক্যামেরার পাশে বসা আব্বু বলেছিলেন, ‘আমি যতক্ষণ কাট না বলি, রাজ্জাক ভাই।’”
নীহাররঞ্জন গুপ্তের ‘বধূ’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটিকে অনেকেই এদেশের প্রথম সাসপেন্স ড্রামা বলে মনে করেন। উপন্যাসটির কপিরাইট কেনার জন্য সিবি জামান ও খান আতা কলকাতায় নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাসায় দুদিন যান। প্রথম দিন ছিল আলাপ-আলোচনা, দ্বিতীয় দিন চুক্তি স্বাক্ষর ও টাকা প্রদান। প্রথম দিন অতিথি হিসেবে তাদের কপালে জোটে শুধু চা। দ্বিতীয় দিন চায়ের সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল দুটি বিস্কুট। সে সময় প্রচণ্ড গরম পড়েছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের পর নীহারবাবু বৈঠকখানার ফ্যান চালিয়ে দিয়ে মজা করে বলেন, ‘যে গরম পড়েছে, অবশেষে ফ্যানটা চালিয়েই দিলুম!’
সিএফ জামান আরও জানান, ‘ঝড়ের পাখি’ মুক্তির তারিখ নির্ধারণের কয়েকদিন পরই ছিল ৭ মার্চ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এমন পরিস্থিতিতে ছবির প্রচারণা নিয়ে সিবি জামান একটি অভিনব কৌশল বের করেন। তিনি তার গুরু ও বন্ধু খান আতাকে বলেন, ‘আমাকে একটি হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করে দিন।’ খান আতা সেই ব্যবস্থা করে দিলে সিবি জামান হেলিকপ্টারে চড়ে সারাদেশে ছবির লিফলেট ছড়িয়ে দেন। এই ভিন্নধর্মী প্রচারণার কারণে ছবিটির প্রথম তিন দিনের সব শোর টিকিট আগাম বিক্রি হয়ে যায়। প্রায় ৩ লাখ টাকা বাজেটের এই ছবিটি তখন প্রায় ৭ লাখ টাকা ব্যবসা করেছিল।


