‘জিন’ ও ‘কালোজাদুর’ ভয় দেখিয়ে বছরের পর বছর নারী ও কিশোরীদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের দায়ে লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের এক ইমামকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
দণ্ডপ্রাপ্ত আবদুল হালিম খান মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অন্তত সাত নারী ও কিশোরীকে নির্যাতন করেন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী কিশোরীও ছিল।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৪ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত আবদুল হালিম খানকে বৃহস্পতিবার স্নেয়ার্সব্রুক ক্রাউন কোর্ট যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে তিনি ২১টি অপরাধ সংঘটিত করেন। আদালত জানায়, তাকে কমপক্ষে ২০ বছর কারাভোগ করতে হবে।
আদালতে বলা হয়, টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আবদুল হালিম খান একজন সম্মানিত ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তিনি ভুক্তভোগীদের আস্থা অর্জন করতেন এবং পরে নির্জন ফ্ল্যাট বা গোপন স্থানে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালাতেন।
তিনি ভুক্তভোগীদের বলতেন, তাদের শরীরে ‘জিনের আসর’ রয়েছে এবং তা দূর করতে বিশেষ ‘শুদ্ধিকরণ’ প্রয়োজন। কেউ বিষয়টি প্রকাশ করলে তাদের বা পরিবারের ক্ষতি হবে বলেও ভয় দেখাতেন।
এমনই এক ভুক্তভোগী কিশোরীকে বলেন, তার জরায়ু ক্যানসার হয়েছে এবং একমাত্র তিনিই তাকে সুস্থ করতে পারবেন। পরে নির্জন স্থানে নিয়ে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করেন এবং দাবি করেন সে ‘সুস্থ’ হয়ে গেছে।
বিচারক লেসলি কথবার্ট আব্দিল হালিম খানের কর্মকাণ্ডকে ‘অবাধ ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযান’ বলে উল্লেখ করেন। বিচারক তাকে ‘ধারাবাহিক ধর্ষক ও শিশু নির্যাতনকারী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, যৌন লালসা চরিতার্থ করতে তিনি পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় অবস্থান অপব্যবহার করেছেন।
আদালত জানায়, ১৯৯০ দশকের শুরুতে ভারত থেকে যুক্তরাজ্যে আসার পর পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচারক হিসেবে কাজ শুরু করেন খান। ১৯৯৬ সালে তিনি একটি মসজিদে দায়িত্ব পান।
মামলায় উঠে আসে, ধর্মীয় চিকিৎসা ও ব্যক্তিগত পরামর্শের কথা বলে তিনি ভুক্তভোগীদের আলাদা বৈঠকে ডাকতেন। কিছু ভুক্তভোগীকে যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোনও দিয়েছিলেন। এক কিশোরীকে বাড়ি থেকে বের হয়ে গোপনে দেখা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
প্রসিকিউটররা বলেন, খান অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, ভুক্তভোগীরা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। তবে ফোন রেকর্ড ও তদন্তে পাওয়া বিভিন্ন প্রমাণ তার বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।
মেট্রোপলিটন পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, ২০১৮ সালে সবচেয়ে কম বয়সী ভুক্তভোগী একজন স্কুলশিক্ষককে বিষয়টি জানালে তদন্ত শুরু হয়। পরে আরও কয়েকজন ভুক্তভোগীর কাছ থেকে এসব কথা জানা যায়।
মামলায় সাক্ষ্য দেওয়া আইশা গিল বলেন, খান ধর্মীয় বিশ্বাস ও আস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এটি ‘বিশ্বাসের প্রকাশ নয়, বরং বিশ্বাসের অপব্যবহার’।
ভুক্তভোগীদের লিখিত বক্তব্যে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমার কথা উঠে আসে। এক নারী বলেন, ‘আমার নিজের শরীরের ওপর আমার যে স্বাধীনতা থাকার কথা ছিল, সে তা কেড়ে নিয়েছে।’ আরেক ভুক্তভোগী খানকে ‘অশুভর প্রতিচ্ছবি’ বলে বর্ণনা করেন।
বিচারক বলেন, আবদুল হালিম খান বিশ্বাস করতেন তার ধর্মীয় মর্যাদা তাকে রক্ষা করবে এবং সামাজিক লজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগীরা মুখ খুলবে না। তার মধ্যে অনুশোচনার কোনো লক্ষণ নেই এবং তিনি হয়তো আর কখনও মুক্তি নাও পেতে পারেন।
তবে দণ্ড ঘোষণার পরও আদালতে আবদুল হালিম খানের সমর্থকদের পক্ষ থেকে এমন কিছু চিঠি জমা পড়ে, যেখানে রায় মেনে না নেওয়ার কথা জানানো হয়।
ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এ ঘটনা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের অপব্যবহারের ঝুঁকির বিষয়গুলো সামনে এনেছে।


