‘মেঘের রাজ্য’ নামে পরিচিত সাজেক ভ্যালিও এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। চলমান জ্বালানি সংকটে শুধু সেখানকার দৈনন্দিন জীবনই ব্যাহত হচ্ছে না, বরং দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্রও হচ্ছে বিপদের মুখোমুখি।
সাজেকের রিসোর্ট এবং কটেজগুলো সচল রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সংকট না কাটলে সাময়িকভাবে পর্যটন কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ মালিক সমিতির তথ্যমতে, জ্বালানি স্বল্পতার কারণে উপত্যকায় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। আগে রিসোর্টগুলোতে পানি পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রায় ৪০টি যানবাহন ব্যবহৃত হতো, কিন্তু ডিজেলের অভাবে এখন মাত্র ১৫টি গাড়ি চলাচল করছে।
এই সীমিত সরবরাহ পেতেও গুণতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ, যাতে ভোগান্তি পোহাচ্ছে ব্যবসায়ী এবং পর্যটক—সবাই। গত বছর ঈদের পর সাজেকে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও, এ বছর সেই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

বিদ্যুতের সমস্যাও এখন প্রকট। হালকা বৃষ্টি হলেই সাজেক জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু জ্বালানি সংকটে বন্ধ রাখতে হচ্ছে জেনারেটর পরিচালনা।
‘খয়াল বুক রিসোর্ট’-এর ম্যানেজার রাসেল চাকমা বলেন, ‘জ্বালানি ছাড়া আমরা মৌলিক সেবাগুলোও দিতে পারছি না, ফলে পর্যটকরাও আর আসছেন না। গত বছরের তুলনায় সাজেক এখন প্রায় জনশূন্য।’
জুম্মবি রেস্টুরেন্টের মালিক সুমেধ চাকমা একইভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টিতেই বিদ্যুৎ চলে যায়। নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে আমরা জেনারেটর ব্যবহার করতাম, এখন সেগুলোও বন্ধ। পানি সরবরাহও সীমিত; পর্যটকরা যে মানের সেবা প্রত্যাশা করেন, আমরা তা দিতে পারছি না।’

চলমান সংকট কেবল ব্যবসার ক্ষতি করছে না, বরং প্রভাব ফেলছে শ্রমিকদের জীবনযাত্রাতেও। পানি সরবরাহকারী যানের চালক বোধিসত্ত্ব চাকমা জানান, আগে ৪০টি গাড়ির জন্য দিনে ১,২০০ থেকে ১,৩০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হতো। সম্প্রতি মাত্র ২০০ লিটার পাওয়া যাচ্ছে, যার ফলে অনেক চালক কাজ বন্ধ করে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। দূরবর্তী স্থান থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করাও এখন অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে
এসব সমস্যার পাশাপাশি পর্যটন উন্নয়নের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলোও আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ মালিক সমিতির এপ্রিলে বান্দরবানের থানচিতে একটি সফরের পরিকল্পনা ছিল, যা জ্বালানি সংকটের কারণে বাতিল করা হয়েছে। সমিতির সভাপতি সুর্পন দেব বর্মা সতর্ক করে বলেন, ‘যদি জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকে, তবে সাজেকের রিসোর্ট ও কটেজগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।’
মেঘে ঢাকা সাজেকের পাহাড়গুলো যখন পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে, তখন এটি স্পষ্ট যে জ্বালানি সংকট শুধু অবকাঠামোগত নয়; এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রিয় পর্যটন কেন্দ্রের অস্তিত্বের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


