সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী অভিযানের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, বরং তিনি নিজের অবস্থানে অনড়। তিনি (হাসিনা) বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।
ব্রিটিশ অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী আওয়ামী লীগ প্রধান, যিনি ১৫ বছরেরও বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিইনি।’
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানকে ‘সহিংস বিদ্রোহ’বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্য মাঠে শৃঙ্খলা ভেঙে ফেলেছিল। একজন নেতা হিসেবে আমি নেতৃত্বের দায় স্বীকার করি, কিন্তু আমি গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছি বা এই ধরনের হত্যাযজ্ঞ চেয়েছি—এ দাবি সম্পূর্ণ ভুল।’
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে কয়েক সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ ও সহিংসতার পর তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। চাকরিতে কোটাব্যবস্থার প্রতিবাদে শুরু হওয়া এ আন্দোলন দ্রুতই সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের শুরুর দিকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন নিহত ও কয়েক হাজার আহত হয়েছিলেন। এটা ছিল স্বাধীনতার পর দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক সহিংসতা। অধিকাংশ মৃত্যুই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ঘটেছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সে সময় বলেছিল, ‘প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের প্রতি সরকারের সম্পূর্ণ অসহিষ্ণুতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি এই মৃত্যুর সংখ্যা।’জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকে ‘অত্যন্ত নিন্দনীয় ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ এনে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করেছে। প্রসিকিউশন তাকে হত্যাকাণ্ডের ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং তার মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে। আগামী ১৩ নভেম্বর মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করবে আইসিটি।
এদিকে নিজের অনুপস্থিতিতে চলা এই বিচারকে ‘প্রহসন’ বলে মন্তব্য করেছেন হাসিনা।
সংবাদমাধ্যম রয়টার্স-কে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও ভূমিকা রাখবে। আর তা সরকারে হোক কিংবা বিরোধী দলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা আমার বা আমার পরিবারের ব্যাপার নয়। বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ অর্জনের জন্য সাংবিধানিক শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবার দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না।’
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে হাসিনা বলেন, ‘পরবর্তী সরকারকে অবশ্যই নির্বাচনী বৈধতা অর্জন করতে হবে। লাখ লাখ মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক, তারা ভোট না দিলে নির্বাচনী প্রক্রিয়া কার্যকর হবে না। একটি কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা চাইলে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগহীন কোনো সরকারের অধীনে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন না এবং আপাতত ভারতে অবস্থান করবেন।’


