বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন দু’টি সমান্তরাল সংকটের দোলাচলে দাঁড়িয়ে আছে বিএনপি। একটি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতি, অন্যটি তার ছেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কবে দেশে ফিরবেন। একটি সংকট অন্যটিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রাক্কালে এই দুই সংকট মিলে জল্পনা-কল্পনার এক ধূম্রজাল সৃষ্টি করেছে।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতা এখন আবেগ, নৈতিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। একজন সন্তানের কাছ থেকে আশা করা হয়, সে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অসুস্থ মায়ের শয্যাপাশে ছুটে আসবে। তবুও, তারেক রহমান সব আবেদন, চাপ এবং জনপ্রত্যাশা উপেক্ষা করে লন্ডনেই রয়ে গেছেন। তার এই অনুপস্থিতি ফিসফিসানি, সন্দেহ এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে আরও উসকে দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি উদাসীনতা নয়, বরং সতর্কতা; রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশ, যা পারিবারিক আবেগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তারপরও, সাধারণ মানুষের কাছে এই ব্যাখ্যাগুলো অস্পষ্ট।
এদিকে, খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও বিভ্রান্তিকর ‘নাটকে পরিণত’ হয়েছে। প্রথমে কাতারের আমিরের দেওয়া অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে বলা হয়েছে, কারিগরি কারণে এটি আসতে দেরি হচ্ছে। পরে বিএনপির দিক থেকে এই অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আর কোনো ব্যাখ্যা শোনা যায়নি।
চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে স্থানান্তরের জন্য ছাড়পত্র দিতে অনীহার খবর তার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জল্পনা আরও বাড়িয়েছে। কাতারের আমিরের ব্যবস্থাপনায় আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে, সেটি নিয়েও আবার নীরবতা নেমে আসে। সময় গড়িয়েছে, অনিশ্চয়তা গভীর হয়েছে, এবং ঘটনাপ্রবাহ আরও জট পাকিয়েছে।
স্বচ্ছতার অভাবে গুজবই এখন আলোচনার প্রধান বিষয়। অনেকে এখন প্রশ্ন তুলছেন, খালেদা জিয়া ক্লিনিক্যালি জীবিত আছেন, নাকি একটি কৌশলগত মুহূর্তের জন্য তাকে রাজনৈতিকভাবে ‘বাঁচিয়ে’ রাখা হচ্ছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার বিবৃতি পরিবর্তন করায় শুধু তার শারীরিক অবস্থা নয়, বরং এর পেছনের উদ্দেশ্য নিয়েও অবিশ্বাস বেড়েছে। এই সন্দেহ এখন কেবল আবেগের নয়—এটি রাজনৈতিকও।
বিএনপির এই অস্বচ্ছতা অন্যদের জন্য এনে দিচ্ছে সুবিধা। আর এই সুবিধা নিতে পারে মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য বিতর্কিত জামায়াতে ইসলামী। এই দলটি এক সময় বিএনপির মিত্র হলেও একাত্তরের ভূমিকার কারণে তাদেরকে এখন দূরে ঠেলে দিয়েছেন তারেক রহমান। বিএনপি যখন খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য ও তারেক রহমানের ফিরে আসা নিয়ে অস্পষ্টতায় হোঁচট খাচ্ছে, তখন জামায়াত চুপিসারে রাজনৈতিক পরিসরে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করছে।
এই পটভূমিতে, বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি নতুন প্রত্যাশা ঘুরপাক খাচ্ছে: নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই ফিরবেন তারেক রহমান। এর পেছনে যুক্তিও আছে: তারেক রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসে পৌঁছাবেন, প্রচারণার নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন, নেতৃত্বকে সুসংহত করবেন এবং খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলকে পরিচালনা করবেন। যদি তফসিল ঘোষণা একটি উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে, তবে তারেক রহমানের দেশে ফেরা হবে শীর্ষ রাজনীতিতে প্রবেশাধিকার হবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, তিনি কেবল তখনই দেশে ফিরবেন যখন তার দল নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসবে।
তবে তারেক রহমানের সমর্থকেরা এই ভবিষ্যতের কথা জোর গলায় বলেন না। বরং সতর্ক স্বরে আলোচনা করেন। ফিসফিস করে তারা একটি আশাবাদী ঘটনাবলির তালিকা তৈরি করেন। যে আশাবাদের মধ্যে আছে। খালেদা জিয়া দলের আবেগের কেন্দ্রকে স্থিতিশীল করার জন্য যথেষ্ট দিন বেঁচে থাকবেন। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করবে। তারেক রহমান শেষমেশ ঢাকায় ফিরবেন এবং জরুরি ভিত্তিতে দলের লাগাম ধরবেন। বিএনপি নতুন কর্তৃত্ব নিয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রবেশ করবে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আন্তর্জাতিক চাপ, দলের ঐক্য, ভোটারদের মনোভাব এবং তারেক রহমানের নিজের ঝুঁকি গ্রহণের হিসাব-নিকাশ সবকিছুকেই মিলতে হবে। তত্ত্বে এটি একটি পরিচ্ছন্ন সমীকরণ, কিন্তু বাস্তবে এর নিশ্চয়তা অনেক কম।
এই তত্ত্ব কার্যকর হোক বা না হোক, খালেদা জিয়ার বেঁচে থাকা এখনো প্রতীকী এবং কৌশলগত উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। জীবিত খালেদা জিয়া বিএনপিতে তারেক রহমানের কর্তৃত্বকে নিশ্চিত করে। আর অনুপস্থিত খালেদা জিয়া দলের মধ্যে এমন একটি হিসাব-নিকাশের সূচনা করবে, যার জন্য হয়তো তারা প্রস্তুত নয়। এমনকি খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে উঠলেও, সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করা হয়তো আর সম্ভব হবে না। আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর হোক বা না হোক, নেতৃত্ব কার্যত তার ছেলের হাতে চলে গেছে।
এই নাজুক মুহূর্তটি বিএনপিতে পুনরুজ্জীবন ঘটাবে নাকি ভাঙন সৃষ্টি করবে, তা এরই মধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনার চেয়েও নির্বাচনের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।


