জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনের প্রচারণার শেষ দিন ছিল নয় সেপ্টেম্বর। শেষ দিন পর্যন্ত ভোটারদের সমর্থন আদায়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রার্থীরা।
রাত পেরোলেই পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিতে ভোট দেবেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তার আগে শেষ দিনের প্রচারণায় মঙ্গলবার সকাল থেকেই মাঠে সক্রিয় ছিলেন বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ, হল এবং ক্যাম্পাস ঘুরে শিক্ষার্থীদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
এবারের জাকসু নির্বাচনে ভোটারদের প্রায় অর্ধেকই নারী, তাই নারী শিক্ষার্থীদের বিষয়ে বিশেষভাবে মনোযোগী দেখা গেছে প্রার্থীদের। প্রার্থীরা যেমন নারী ভোটারদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তেমন নারী শিক্ষার্থীরাও প্রার্থীদের কাছে তাদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন।
প্রচারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
আসন্ন নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন ‘স্টুডেন্ট ইউনিটি ফোরাম’ প্যানেল থেকে কো-কালচারাল সেক্রেটারি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ফাতেমা তুজ জোহরা বৈশাখী। তিনি বলেন, ‘ভোটারদের কাছ থেকে আমরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি। অনেক বিভাগের ফাইনাল পরীক্ষা ও নির্বাচনের তারিখ এক হওয়ায় আমরা অনেক শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাতে পারিনি। সেদিক থেকে আমাদের প্রচারের প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি ইতিবাচক বলা যাচ্ছে না।’
‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেল থেকে কেন্দ্রীয় সংসদের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদপ্রার্থী আতিকুর রহমান জনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুরাদ চত্বরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রচারণার অল্প সময়ে সবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে আমি মনে করি, যোগ্য প্রার্থীকে খুঁজে নেওয়াটাও ভোটারদের দায়িত্ব। একজন কবি যদি প্রচারের কারণে হেরেও যান, তিনি তবুও কবি থাকেন।’

নারী প্রার্থীদের অভিজ্ঞতা
নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে নেতিবাচক পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন নারী প্রার্থীরা। কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদপ্রার্থী ফারিয়া জামান নিকি বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা দেখেছি, হলে হলে কিছু গ্রুপ শিক্ষার্থীদের টার্গেট করছে, তাদেরকে ট্যাগও দেওয়া হচ্ছে।’
একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সোহাগি সামিয়া বলেন, ‘এই ক্যাম্পাসে ঐতিহাসিকভাবে নারীরা নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। তাই এবারের নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ কম থাকাটা আমাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।’
নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি
আগামী জাকুস নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে, ভোটের দিন পুরো ক্যাম্পাসে ১২০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক রশিদুল আলম বলেন, ‘নির্বাচনের দিন নিরাপত্তা রক্ষার্থে আমরা ১২০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করবো, যার মধ্যে অনেকেই সাদাপোশাকে থাকবেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শহরের বাইরে হওয়ায় এবং আশেপাশে গ্রামাঞ্চল থাকায়, সেনাবাহিনীও র্যাপিড রেসপন্স ফোর্স হিসেবে স্ট্যান্ডবাই থাকবে।’

ডোপ টেস্ট নিয়ে বিতর্ক
সব প্রার্থীর জন্য ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক হলেও, প্রচারের শেষ দিনে এই ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি হয় ব্যাপক বিতর্ক। কারণে তাতে বিঘ্ন ঘটছিল প্রচারে।
নির্বাচনে কো-সোশ্যাল সার্ভিস সেক্রেটারি (নারী) পদপ্রার্থী তাম্মি রহমান বলেন, ‘এরকম অত্যন্ত ব্যস্ত একটি দিনে আমাদেরকে ডোপ টেস্টের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। প্রবেশের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে অনেকক্ষণ।’
‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেল থেকে সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদপ্রার্থী রাহাতুল ফেরদৌস রাত্রী বলেন, ‘এখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছি। প্রচারের শেষ দিনের এই সময়টাতো আমি প্রচারের কাজে লাগাতে পারতাম।’ বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবেই দেখছেন তিনি।
নির্বাহী সদস্য পদপ্রার্থী এরফানুল ইসলাম ইফতু অভিযোগ করেন সেখানকার পরিবেশ নিয়ে। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৭৫০ জন প্রার্থী এখানে এসেছে। টয়লেটের অবস্থা এতই খারাপ, যা আমি আগে কখনো দেখিনি। মেয়েদের ইউরিন ইনফেকশনের ঝুঁকি আছে। এমনকি হ্যান্ড স্যানিটাইজারও নেই।’
তবে নির্বাচন কমিশনের পাঠানো চিঠির ভিত্তিতেই ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ বলেন, ‘প্রার্থীরা স্বেচ্ছায় এতে অংশ নিচ্ছেন।’
প্রার্থিতা প্রত্যাহার
প্রচারের শেষ দিনে, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া এক সংবাদ সম্মেলনে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, ‘আমি যদিও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি, তবে এই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা আমার পাশে ছিলেন, তাদের ভালোবাসা ও আস্থার জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। তবে জাকসু নির্বাচনের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে, আমি মনে করি, সমমনা শিক্ষার্থীদের এক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর কল্যাণে কাজ করা উচিত। তাই আমি আমার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করছি।’
‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—আমরা ভিন্নমত পোষণ করলেও, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় উগ্রবাদ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থেকেছে। আমি ভবিষ্যতেও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাবো’, যোগ করেন তিনি।
নির্বাচনের সার্বিক চিত্র
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত মোট আটটি জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সর্বশেষ নির্বাচনটি হয়েছিল ১৯৯২ সালে। গত বছরের ৫ আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের পর, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৩০ বছর পর আবার জাকসু নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপ ঘোষণা করে।

জাকসুতে নির্বাচনী প্রচারণা। ছবি: অনিক রহমান/টাইমসএ বছর ২৫টি কেন্দ্রীয় পদে ১৭৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় রয়েছে: সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে নয় জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নয় জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে ছয় জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে ১০ জন, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে নয় জন, পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক পদে ছয় জন, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে আট জন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে আট জন, সহকারী সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে আট জন, নাট্য সম্পাদক পদে পাঁচ জন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে তিন জন।
এছাড়া সহকারী ক্রীড়া সম্পাদক পদে ছয় জন, তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক পদে সাত জন, সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পাদক পদে আট জন, সহকারী সমাজসেবা সম্পাদক (নারী) পদে সাত জন, সহকারী সমাজসেবা সম্পাদক (পুরুষ) পদে সাত জন, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক পদে সাত জন, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে সাত জন। নির্বাহী সদস্য (নারী) পদে ১৬ জন ও নির্বাহী সদস্য (পুরুষ) পদে ২৬ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এছাড়াও, ১১টি ছেলেদের হলে মোট ১৬৫টি পদে ৩১৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৬১টি পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। আরও ৭টি পদে কেউ মনোনয়ন জমা দেননি, ফলে সেগুলো শূন্য থাকবে। বাকি ৯৭টি পদে ভোটগ্রহণের মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচিত হবেন।
১০টি মেয়েদের হলে মোট ১৫০টি পদের মধ্যে মাত্র ৩৪টি পদে ভোট হবে। ৫৮টি পদে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন এবং বাকি ৫৮টি পদে কোনো মনোনয়ন জমা না পড়ায় সেগুলো শূন্য থাকবে।
চূড়ান্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, মোট ভোটার সংখ্যা ১১ হাজার ৯১৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় হাজার ১০২ জন এবং নারী ভোটার পাঁচ হাজার ৮১৭ জন।
১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ চলবে। এরপর ভোট গণনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ফলাফল ঘোষণা করা হবে সন্ধ্যা ৭টায়।


