জাকসু নির্বাচনে ‘নজিরবিহীন নাটকীয়তা’ 

জাকসু নির্বাচনে ‘নজিরবিহীন নাটকীয়তা’ 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন শেষে ব্যালট বাক্স নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছবি: অনিক রহমান/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

কামরুজ্জামান খান/কেএম জাদিদ বিন খালিদ ।।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে ‘অনেক নাটকীয়তার’ পর ঘোষিত হয়েছে ফলাফল। ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘন্টা পর শনিবার সন্ধ্যায় ঘোষিত ফলাফলে জাকসুর দশম ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী প্যানেলের আব্দুর রশিদ জিতু। জিএস পদে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের মাজহারুল ইসলাম, একই প্যানেল থেকে এজিএস (পুরুষ) ফেরদৌস আল হাসান ও এজিএস (নারী) আয়েশা সিদ্দীকা মেঘলা নির্বাচিত হয়েছেন।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভিপি পদে এক প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রার্থীতা বাতিল, সবার প্রার্থীতা নিশ্চিত করে দুইদিন আগে মাদকাসক্তি শনাক্ত পরীক্ষা (ডোপ টেস্ট) করিয়ে রিপোর্ট না দেওয়া, ওএমআর ব্যালট পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করে ডিজিটাল মেশিনে গণনার সিদ্ধান্ত বাতিল, শেষ সময়ে ছাত্রদল এবং পরবর্তীতে আরো চার প্যানেলের ভোট বর্জন, পাঁচ শিক্ষকের নির্বাচন কমিশন থেকে পদত্যাগ, ভোট গণনাকালে এক শিক্ষিকার মৃত্যু, ভোট গণনায় বিলম্বের প্রতি ক্যাম্পাসে ও ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল, বিলম্বিত ফলাফল ঘোষণার কয়েক ঘন্টা আগেই তা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া–সবমিলিয়ে একটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে একের পর এক এতো ‘নাটকীয়তা নজিরবিহীন’।

এছাড়া জাকসু নির্বাচনের শুরু থেকেই কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী একাধিক প্রার্থী ও প্যানেল থেকে অভিযোগ ছিল।

জাকসু নির্বাচনের ভোট গণনা চলছে। ছবি: টাইমস

শনিবার সন্ধ্যার পর ঘোষিত জাকসুর ফলাফলে ২৫টি পদের মধ্যে ২১টিতে জয় পেয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থী। ভিপি ও তিনটি সম্পাদকীয় পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে। ভিপি পদে বিজয়ীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ছাত্রশিবির সমর্থিত প্রার্থী আরিফ উল্লাহ। প্রতিটি পদে ছাত্রদল সমর্থিতরা পিছিয়ে পড়েছেন বড় ব্যবধানে।

নবনির্বাচিত ভিপি জিতু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গণঅভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলন’ প্ল্যাটফর্মের আহবায়ক। কোটা সংস্কার আন্দোলনের আগে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও আন্দোলনের সময় সর্বপ্রথম ছাত্রলীগের হাতে মার খেয়ে আহত হন। পরে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি।

উত্তাপ ও বিতর্কের মধ্যে উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান শুক্রবার বিকেলে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ঘন্টাখানেক ধরে বৈঠককালে ভোট গণনা বন্ধ ছিল। বৈঠক শেষে ফের গননা শুরু হয়। তার ওই বৈঠক ও সময়ক্ষেপণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে বিকালে ভোটগ্রহণকালে কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রোভোস্ট অধ্যাপক শামসুল সালেহীন ক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান স্বীকার করে বলেছেন, তারা জানতেন মেশিনে ভোট গণনা করা হবে। হাতে গণনা করার প্রস্তুতি ছিল না কারো। শেষ মুহুর্তে হাতে গণনা করার সিদ্ধান্ত হলে আগের রাতে প্রশিক্ষণ হয়। যা পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, ‘সনাতন পদ্ধতিতে (ম্যানুয়ালি) গণনার কারণে ফল প্রকাশে বিলম্ব হয়।’

নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার। ছবি: টাইমস

ছাত্রী সংস্থার নামে জাল ভোটের অভিযোগে বৃহস্পতিবার বিকালে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানা ও গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম এবং শুক্রবার রাত ৯টার দিকে জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য, ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার নির্বাচনের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।

আরও পড়ুন

নির্বাচন কমিশনের আরেক সদস্য ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা শনিবার দুপুরে তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন, ‘অদৃশ্য চাপ আমাকে এই কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করতে নৈতিকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।’

তার অভিযোগ, ‘ব্যালট পেপার, বাজেট চূড়ান্তকরণ ও অমর্ত্য রায়ের ভিপি পদ প্রার্থিতা বাতিল সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমি ওয়াকিবহাল না।’

কমিশনের একজন সদস্যের এমন বক্তব্য গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরো বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান পদত্যাপপত্রে এমন অভিযোগ উল্লেখ থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

জাকসুতে একজন ভোটারকে বিভিন্ন পদে সবমিলিয়ে ৪০টি ভোট দিতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় সংসদে মোট ২৫টি পদে লড়েন ১৭৭ জন প্রার্থী। ২১টি হল সংসদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভোট দিয়েছেন ৮ হাজার ১৬ জন শিক্ষার্থী। হিসাব করলে নির্বাচন কমিশনকে ভোট গুনতে হয় ৩ লাখ ২০ হাজার ৬৪০টি।

ভিপি পদে প্রার্থী ৯ জন, জিএস পদে ৮ জন, এজিএস (নারী) পদে ৬ জন এবং এজিএস (পুরুষ) পদে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। প্রতি হলে পদসংখ্যা ১৫টি। ২১টি হল সংসদে মোট পদ ৩১৫টি। এতে ৪৭৭ জন প্রার্থী হন। ছাত্রীদের ১০টি আবাসিক হলে ১৫০টি পদের মধ্যে ৫৯টিতে কোনো প্রার্থী ছিল না, একজন করে প্রার্থী ছিল ৬৭টি পদে। সেই হিসাবে মাত্র ২৪টি পদে ভোট হয়।

জাকসুর ভোট গণনাকালে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া পোলিং কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস। ছবি: সংগৃহীত

 

পর্যবেক্ষকদের মতে, এ অবস্থায় ৩৩ বছর পর হওয়া জাকসু নির্বাচনের ফল সনাতন পদ্ধতিতে ভোট গণনা, পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগসহ পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া কীভাবে দ্রুত সম্পন্ন করা যায়, সে সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের কোনো পূর্ব ধারণা বা প্রশিক্ষণ—কোনটাই ছিল না।

ভোট গণনার জন্য প্রথমে ৫টি টেবিল, পরে বাড়িয়ে ১১টি এবং সর্বশেষ ১৩টি টেবিল বসানো হয়। দফায় দফায় পাল্টানো হয় গণনাকারীও। শুক্রবার ও শনিবার নির্বাচন কমিশন কয়েকবার ফলাফল ঘোষণা সময়সূচি দিয়েও দৃশ্যত তা রক্ষা করতে পারেনি।

সবশেষ, ভোট গণনার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য ও শহীদ তাজ উদ্দিন আহমেদ হলের প্রোভোষ্ট অধ্যাপক লুৎফল এলাহী শনিবার দুপুরে বলেন, ‘ভোট গণনা ৯০ শতাংশ সম্পন্ন  হয়েছে। আড়াইটা নাগাদ গণনা শেষ হবে। তবে কিছু প্রক্রিয়াগত কারণে ফলাফল ঘোষণা করতে সন্ধ্যা হবে!’

ফলাফল ঘোষণার দ্বিতীয় দিনেই ভোট গণনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নওয়াব ফয়জুন্নেছা হলের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. সুলতানা আক্তার। তিনি বলেন, ‘এভাবে সনাতনী পদ্ধতিতে ভোট গুনতে তো তিনদিন লাগবে!’

প্রোভিসি (শিক্ষা) ড. মাহফুজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘অদক্ষতা এবং অনভিজ্ঞতা ভোট গণনা বিলম্বিত হওয়ার মূল কারণ।’

 

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad