জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন পক্ষপাতদুষ্ট এবং গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক।
তাদের মতে, এই নির্বাচনের দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপরই বর্তায়। তারা বলেছে, ‘জাকসু নির্বাচনে যেকোনো প্রকারে একটি দলকে জিতিয়ে আনার লক্ষ্যে সব মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। আমরা এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করি এবং মনে করি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এসব কারসাজি উন্মোচন হওয়া জরুরি।’
সোমবার এক বিবৃতিতে শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ জানানো হয়। ১১ সেপ্টেম্বর জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং দুই দিন ধরে ভোট গণনার পর গত শনিবার বিকালে ফল ঘোষণা করা হয়। ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ২৫টি পদের মধ্যে ২০টি পদ, যার মধ্যে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও দুটি সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদের জয়ী হয় ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট।
শিক্ষক নেটওয়ার্কের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির পর এই নির্বাচন ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা তৈরি করেছিল। কিন্তু বাস্তবে এই নির্বাচন ছিল ত্রুটিপূর্ণ এবং বিতর্কিত। নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় মারাত্মক অব্যবস্থাপনার কারণে আমাদের একজন তরুণ শিক্ষক তাঁর জীবন হারিয়েছেন।’
তারা জান্নাতুল ফেরদৌসের মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করে এবং নির্বাচনের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনাকে নিন্দা জানিয়েছে।
নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে শিক্ষকদের চিহ্নিত ১৬টি গুরুতর সমস্যার মধ্যে রয়েছে: ১. ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকা ও ব্যালট। ২. ভিপি প্রার্থী অমর্ত্য রায়কে নির্বাচনের চার দিন আগে অনিয়মিত ছাত্র হিসেবে দেখিয়ে প্রার্থিতা বাতিল করা। ৩. ডোপ টেস্টের দিন ধার্য করা হলেও ব্যালট পেপার ছাপানো হয়নি, যা নির্বাচন কমিশনের অদক্ষতার পরিচায়ক। ৪. নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পাঠানোর অভিযোগ, যদিও এর কোনো প্রয়োজন ছিল না। ৫. প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট রাখার সিদ্ধান্তের শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন, যা বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে। ৬. ভোটকেন্দ্রে প্রার্থীদের ঢুকতে বাধা দেয়া এবং ছাত্রীদের হল পরিদর্শনে প্রার্থী ও সাংবাদিকদের বাধা দেয়া। ৭. অতিরিক্ত ব্যালট পেপার সরবরাহ করা, যা বড় ধরনের সংশয় তৈরি করেছে। ৮. অমোচনীয় কালির দাগ উঠে যাওয়ার ঘটনা, যা ভোট কারচুপির সুযোগ তৈরি করে। ৯. ভোটার তালিকায় নাম না থাকা সত্ত্বেও বৈধ শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে পারেননি। ১০. কিছু হলের প্রার্থীদের নাম না ছাপা বা ভুল নির্দেশনায় ভোট গ্রহণের সমস্যা। ১১. নির্ধারিত সময়ে সব হলে ভোট শেষ না হওয়া, এবং আড়াই ঘণ্টা পরও ভোট গ্রহণ চলা। ১২. ওএমআর পদ্ধতিতে ভোট গণনায় প্রশ্ন ওঠায় এবং হাতে ভোট গণনার সিদ্ধান্তের পর বাস্তব পদ্ধতি অনুসরণ না করা। ১৩. অতিরিক্ত ব্যালট পেপার সরবরাহ ও অমোচনীয় কালির দাগ উঠে যাওয়ার অভিযোগে তিনজন সহকর্মী নির্বাচন থেকে সরে গেছেন। ১৪. নির্বাচনের দিন দুপুরের পর থেকে কিছু প্যানেল নির্বাচন বর্জন করে। ১৫. বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সব খাবারের দোকান ও চায়ের দোকান বন্ধ রাখা, যা উৎসবমুখর পরিবেশকে দমিয়ে দিয়েছিল। ১৬. জামায়াতে ইসলামী নেতাকর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয় ফটকে জড়ো হয়ে চাপ সৃষ্টি করা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এসব ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, কোনো প্রকারে একটি দলকে জিতিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে সব মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রার্থী, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশনারদের বর্জন ও পদত্যাগ উপেক্ষা করা হয়েছে।’
বিবৃতির শেষে তারা আরও জানায়, ‘নির্বাচনের প্রাক্কালে ওএমআর যন্ত্রের দরপত্র বিষয়ক অভিযোগ ওঠে এবং প্রশাসন সমস্যার সমাধান হিসেবে সনাতনী ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে গণনা শুরু করে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড প্রশাসনের দুর্বলতাকে উন্মোচন করে।’
শিক্ষক নেটওয়ার্ক আরও জানায়, ‘এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে নির্বাচনটি পক্ষপাতদুষ্ট এবং গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। এর দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপরই বর্তায়। আমরা এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করি এবং মনে করি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এসব কারসাজি উন্মোচন হওয়া জরুরি।’


