ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। তবে জনপ্রশাসন সংস্কার ও পুনর্গঠন নিয়ে দল দুটির প্রতিশ্রুতিতে বিশেষ কোনো নতুনত্ব দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, অতীতেও এমন অনেক গালভরা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যা পরবর্তীতে আলোর মুখ দেখেনি। ফলে এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তা নিয়ে আশাবাদী হওয়ার বিশেষ কারণ নেই।
গত শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি জনপ্রশাসনকে আমূল বদলে ফেলার অঙ্গীকার করেন।
বিএনপির ইশতেহারে মেধাতন্ত্রের বাংলাদেশ বিনির্মাণ, স্বচ্ছতার সঙ্গে দ্রুততম সময়ে পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগ, নতুন পে-স্কেল ঘোষণা এবং ‘প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। দলটির লক্ষ্য একটি জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা।
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরে জনপ্রশাসন ও পুলিশের একাংশ এতটাই ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিল, তারা জনপ্রতিনিধি এমনকি সংসদ সদস্যদেরও তোয়াক্কা করত না বলে জাতীয় সংসদে অভিযোগ উঠেছিল। আমলাদের বিরুদ্ধে সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার বিনিময়ে নানা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিএনপি তাদের ইশতেহারে এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার কথা জানিয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা হবে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির একমাত্র মাপকাঠি। প্রশাসনে কেউ যেন অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয় তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
ইশতেহারে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে সরকারি দপ্তরগুলোতে পাঁচ লক্ষাধিক শূন্যপদ রয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মেধাবী তরুণদের এসব পদে নিয়োগ দেবে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত বেতন কাঠামো তারা কবে নাগাদ বাস্তবায়ন করবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ না করে কেবল ‘যথাসময়ে’ করার কথা বলেছে বিএনপি।
বিএনপি মনে করে বর্তমান প্রশাসনিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। তাই যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে ‘প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন’ গঠন করে পুরো ব্যবস্থা পুনর্গঠন করা হবে। এ ছাড়া সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়ন, ই-গভর্ন্যান্স চালু এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। এমনকি বেসরকারি চাকুরিজীবীদের জন্য আলাদা সার্ভিস রুল তৈরির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বিএনপি।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব একেএম আব্দুল আউয়াল মজুমদার এসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে সুন্দর কথা বললেও ক্ষমতায় গিয়ে প্রায়ই তা ভুলে যায়। তখন মেধাতন্ত্রের বদলে নিজের দলের লোককে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়।
তবে তিনি নিরাশ হতে চান না, এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চান।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’ শিরোনামে তাদের ইশতেহারে জনপ্রশাসন নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তারা প্রশাসনে স্বচ্ছতা, পেশাদারত্ব ও সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের নিয়মিত জনগণের মুখোমুখি হওয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলেছে।
জামায়াতের ইশতেহারে অনলাইন অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা, ডিজিটাল ও এআই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একটি কেন্দ্রীয় ই-গভর্ন্যান্স পোর্টাল তৈরির মাধ্যমে নাগরিকদের ঘরে বসেই সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
দুর্নীতি রোধে সরকারি অফিসে সিসিটিভি স্থাপন এবং আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ অটোমেটেড করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত। এ ছাড়া আগামী অর্থবছর থেকেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা বলেছে দলটি। তাদের অন্য প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি চাকরিতে আবেদন ফি বাতিল করা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্যাডারের জন্য পৃথক পিএসসি গঠন এবং ডাক্তার-শিক্ষকদের জন্য আলাদা পদোন্নতি ব্যবস্থা চালু করা।
তবে দুই দলের ইশতেহার পর্যালোচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান জানান, বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিশ্রুতির মধ্যে তিনি বড় কোনো নতুনত্ব দেখছেন না। তিনি মনে করেন, এগুলো বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন।
অধ্যাপক সাদিক হাসানের মতে, নির্বাচনের পর ভোটারদের পরোক্ষ ভূমিকা এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ও রাজনৈতিক বাধা এসব সংস্কারের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তিনি আরও মন্তব্য করেন, বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো এমনভাবে তৈরি যে, কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই প্রশাসনকে এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব।


