১৯৮০ সালের পর এশীয় ফুটবলের কোনো সর্বোচ্চ আসরে আবার দেখা গেল লাল-সবুজ পতাকা। পুরুষ দলের পর এবারই প্রথম এশিয়ান কাপের মূল মঞ্চে নামার গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশ নারী দল। মঙ্গলবার সিডনির কমব্যাঙ্ক স্টেডিয়ামে টুর্নামেন্টের একমাত্র নবাগত ও র্যাঙ্কিংয়ের তলানির দল হিসেবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন এবং নয়বারের শিরোপাজয়ী চীনের মুখোমুখি হয়েছিল ঋতুপর্ণা-আফঈদারা। কাগজে-কলমে লড়াইটা ছিল যোজন যোজন ব্যবধানের, যেখানে চীনের খেলোয়াড়দের গড় উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি, সেখানে বাংলাদেশের মেয়েদের গড় ৪ ফুট ৮ ইঞ্চি। তবে মাঠের লড়াকু মানসিকতায় সেই উচ্চতার অভাব ঢেকে দিয়েছিলেন পিটার বাটলারের শিষ্যরা। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলে হারলেও সিডনির ঘাসে বীরোচিত ফুটবল খেলেছে বাংলাদেশ।
ম্যাচের শুরু থেকেই চীন আগ্রাসী ফুটবল খেলতে শুরু করে, আর বাংলাদেশ ব্যস্ত ছিল নিজেদের রক্ষণ সামলাতে। তবে পাল্টা আক্রমণে ১০ মিনিটেই ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। শামসুন্নাহার জুনিয়র চীনের ডি-বক্সে ঢোকার চেষ্টা করলে তাকে ফাউল করে থামান চীনের ২৫ নম্বর জার্সিধারী লিউ ইয়াতং, যার ফলে তাকে হলুদ কার্ড দেখতে হয়। প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক রুপনা চাকমাকে বসিয়ে এদিন মিলি আক্তারকে সুযোগ দেন কোচ পিটার বাটলার। কোচের আস্থার প্রতিদান দিয়ে ১২ মিনিটে ওয়াং শুয়াংয়ের এক দুর্দান্ত শট রুখে দেন মিলি। ১৪ মিনিটে বাংলাদেশের ঋতুপর্ণা চাকমা প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে এক দূরপাল্লার শট নেন, যা চীনের গোলরক্ষক কোনোমতে সেভ করলে গোলের দেখা পায়নি লাল-সবুজরা। ১৮ মিনিটে আফঈদা খন্দকার ও গোলরক্ষক মাইলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চীনের আরও একটি নিশ্চিত আক্রমণ ভেস্তে যায়। ২৪ মিনিটে ওয়াং শুয়াং হেডে গোল করলেও অফসাইডের কারণে তা বাতিল হয়।
প্রথমার্ধের অন্তিম লগ্নে এসে বাংলাদেশের রক্ষণভাগ কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ে। ৪৪ মিনিটে চীনের অভিজ্ঞ তারকা ওয়াং শুয়াং বক্সের বাইরে থেকে দারুণ এক শটে লক্ষ্যভেদ করেন। প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে (৪৫+১ মিনিট) এলোমেলো ডিফেন্সের সুযোগ নিয়ে ব্যবধান ২-০ করেন ঝাং রুই। মিলির সেভ করা বলের ফিরতি শটে গোলটি হয়। বলটি গোল লাইনে আটকাতে গিয়েও ক্যাপ্টেন আফঈদার পায়ে লেগে জড়িয়ে যায় জালে।
দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ তাদের চিরচেনা ‘হাই লাইন’ প্রেসিং ফুটবলে ফিরে আসে। উমেহলা মারমার বদলে তহুরা খাতুনকে মাঠে নামান বাটলার। স্বপ্না মাঠে এনে নবিরনকে তুলে নেয়ার পর বাংলাদেশ চার জনের ব্যাক লাইনে ফিরে যায়। দ্বিতীয় অর্ধে চীনের মতো বিশাল শক্তিশালী দলের বিপক্ষে হাই ডিফেন্স লাইন নিয়ে খেলার ঝুঁকি নিয়েছিল বাংলাদেশ, যার ফলে অনেক সময় চীন ফাঁকা জায়গা পেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল। তবে ঋতুপর্ণা, তহুরা ও শামসুন্নাহার জুনিয়র মিলে ম্যাজিক দেখানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। ৮৬ মিনিটে সুইডেন প্রবাসী আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীকে নামিয়ে আক্রমণের ধার বাড়ানোর চেষ্টা করেন বাটলার। তবুও ম্যাচ শেষে ২-০ গোলের হার নিয়ে ডাগআউটে যায় আফঈদারা।
র্যাঙ্কিংয়ে ১৭ নম্বর দল চীনের বিপক্ষে ১১২ নম্বর দল বাংলাদেশের এই লড়াই হার ছাপিয়ে এক বড় জয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সিডনির সন্ধ্যার আকাশে আজ হারের গ্লানি নয়, বরং এক গর্বিত বাংলাদেশের ছবি ফুটে উঠেছে। এশিয়ান কাপের মূল মঞ্চে প্রথম অভিষেক হিসেবে ৯ বারের চ্যাম্পিয়নদের আটকে রেখে মাত্র ২-০ গোলে ম্যাচ শেষ করাটা মেয়েদের সাহসিকতারই প্রমাণ দেয়।


