জনপ্রিয় রাইড-হেইলিং প্রতিষ্ঠান (যাত্রী পরিবাহী) উবারকে ৮৫ লাখ ডলার (প্রায় ১০৫ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯ বছর বয়সী এক নারী যাত্রীর ওপর উবারের এক গাড়ি চালকের যৌন অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এই রায় দেয় মার্কিন ফেডারেল আদালত।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, বৃহস্পতিবার ঘোষিত এই রায় বিশ্বের বিভিন্ন আদালতে উবার চালক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চলমান হাজারও মামলার বিচারেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতেও উবারের বিরুদ্ধে তিন হাজারের বেশি যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত মামলা রয়েছে।
মার্কিন আদালতের নথি অনুযায়ী, মামলার বাদী জেইলিন ডিনের পক্ষে রায়ই উবারের বিরুদ্ধে এ সংক্রান্ত মামলার প্রথম বিচার, আইনি ভাষায় যা ‘বেলওয়েদার ট্রায়াল’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। এ ধরনের বিচার ভবিষ্যৎ মামলার কৌশল যাচাই এবং সম্ভাব্য সমঝোতার পর আর্থিক ক্ষতিপূরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ওকলাহোমার বাসিন্দা ডিন ২০২৩ সালে উবারের বিরুদ্ধে এ মামলা করেন। মামলার নথি অনুযায়ী, ডিন মদ্যপ অবস্থায় তার প্রেমিকের বাড়ি থেকে হোটেলে যাওয়ার জন্য উবার ডাকেন। যাত্রাপথে চালক তাকে হয়রানিমূলক প্রশ্ন করেন এবং পরে গাড়ি থামিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন।
অ্যারিজোনায় তার ওপর কথিত যৌন নির্যাতনের ঘটনার এক মাস পরই তিনি আইনি পদক্ষেপ নেন। মামলায় ডিন অভিযোগ করেন, উবার জানত- তাদের চালকদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে, তবুও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় মৌলিক পদক্ষেপ তারা নেয়নি। এ ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই উবারকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি করেছে এবং বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও সংবাদমাধ্যমের নজর কেড়েছে।
ডিনের আইনজীবীরা ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৪০ মিলিয়নেরও বেশি ডলার দাবি করেছিলেন। তবে অ্যারিজোনার ফিনিক্সে ফেডারেল আদালতের জুরি রায়ে বলেন, অভিযুক্ত চালক উবারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। ফলে তার কর্মকাণ্ডের দায় উবারের ওপর বর্তায়। ভুক্তভোগীকে ৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণমূলক অর্থ দেওয়ার নির্দেশ দিলেও উবার চালককে শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
এই রায় ঘোষণার পর আফটার-আওয়ার্স লেনদেনে উবারের শেয়ারের মূল্য ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়। একই ধরনের মামলার মুখোমুখি থাকা উবারের প্রতিদ্বন্দ্বী আরেক রাইড হেইলিং প্রতিষ্ঠান লিফট ডট ও-এর শেয়ারও ১ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পায়।
উবার এক বিবৃতিতে জানায়, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে। কোম্পানির একজন মুখপাত্র বলেন, জুরি ডিনের করা উবারের অবহেলা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটির অভিযোগ গ্রহণ করেনি।
তিনি বলেন, ‘এই রায় প্রমাণ করে যে উবার দায়িত্বশীলভাবে কাজ করেছে এবং যাত্রী নিরাপত্তায় অর্থবহ বিনিয়োগ করেছে।’
তবে বাদীপক্ষের আইনজীবী সারা লন্ডনের মতে, এই রায় ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এই রায় হাজার হাজার ভুক্তভোগীর কণ্ঠকে স্বীকৃতি দেয়, যারা উবারের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে সামনে এসেছেন। কারণ উবার যাত্রী নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।’
বিচার চলাকালে বাদীপক্ষের আইনজীবী আলেকজান্দ্রা ওয়ালশ বলেন, উবার তাদের প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ করে রাতে একা ভ্রমণকারী নারীর জন্য, এমনকি যারা মদ্যপ অবস্থায় থাকেন তাদের জন্যও একটি নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে প্রচার করেছে।
‘নারীরা জানে পৃথিবীটা বিপজ্জনক। আমরা জানি যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি আছে। কিন্তু উবার আমাদের বিশ্বাস করিয়েছে, এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে আমরা সেই ঝুঁকি থেকে নিরাপদ থাকব’, যোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে উবার দাবি করে আসছে, তাদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারী চালকদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কোম্পানিকে দায়ী করা উচিত নয়। চালকরা স্বাধীন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নন। এমনকি তাদের অবস্থান যাই হোক না কেন, চালকদের এমন আচরণের জন্য উবার দায় নিতে পারে না। কারও ব্যক্তিগত অপরাধ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সীমার বাইরে পড়ে।
উবারের আইনজীবী কিম বুয়েনো বলেন, ‘অভিযুক্ত চালকের কোনো অপরাধমূলক ইতিহাস ছিল না। একেবারেই না।’
তিনি জানান, ওই চালক অ্যাপে প্রায় ১০ হাজার ট্রিপ সম্পন্ন করেছিলেন এবং যাত্রীদের কাছ থেকে প্রায় নিখুঁত রেটিং পেয়েছিলেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘তিনি যৌন অপরাধ সংঘটন করবেন, এ বিষয়ে উবারের পক্ষে পূর্বানুমান করা কি সম্ভব ছিল? এর উত্তর অবশ্যই না।’
ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য আদালতেও উবারের বিরুদ্ধে ৫০০টির বেশি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে একমাত্র যে মামলাটি এখন পর্যন্ত বিচার পর্যায়ে গেছে, সেখানে গত সেপ্টেম্বরে জুরি উবারের পক্ষেই রায় দেন। ওই জুরি উবারের নিরাপত্তা অবহেলার কথা স্বীকার করলেও তা ভুক্তভোগীর ক্ষতির প্রধান কারণ ছিল না বলে রায়ে উল্লেখ করেন।


