উৎসব এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে–বাংলাদেশের এই দীর্ঘদিনের চেনা বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ঈদুল আজহা উপলক্ষে চট্টগ্রামে ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন।
‘উৎসবে কমবে দাম, বাড়বে আনন্দ’ স্লোগানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার নেতৃত্বে বাস্তবায়িত ‘ফেস্টিভ সেল’ কর্মসূচি বাজারে দারুণ স্বস্তি এনে দিয়েছে।
ব্যবসায়ী, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যমের সমন্বিত অংশগ্রহণে এই উদ্যোগ চট্টগ্রামে একটি নতুন সামাজিক ও ব্যবসায়িক সংস্কৃতির সূচনা করেছে।
এই কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর শনিবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি জেলা প্রশাসনের নেতৃত্ব, ব্যবসায়ীদের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বিত কাজের এক অনন্য স্বীকৃতির মঞ্চে পরিণত হয়।
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। জাহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বক্তারা তার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং এই ইতিবাচক উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, বাংলাদেশে সম্ভবত এবারই প্রথম পণ্যের দাম কমানোর জন্য ব্যবসায়ীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি নতুন সংস্কৃতির সূচনা। এই ধারা অব্যাহত থাকলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এই পরোপকারী উদ্যোগের পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
র্যাব-৭-এর অধিনায়ক কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলাম এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, জেলা প্রশাসকের বলিষ্ঠ আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা জনকল্যাণমূলক একটি প্ল্যাটফর্মে যেভাবে একসঙ্গে কাজ করেছেন, তা ভবিষ্যতের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ের পুলিশ সুপার চাউলাউ মারমা উল্লেখ করেন, বাজারকে শুধু আইন বা শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; ব্যবসায়ীদের এই সামাজিক দায়িত্ববোধই প্রকৃত পরিবর্তন এনেছে।
অনুষ্ঠানে ডিজিএফআইয়ের উপ-পরিচালক নুরুল হক এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ইমরান হোসেন খাতুনগঞ্জের আদার সংকট নিরসনে জেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক সমন্বয়ের কথা তুলে ধরেন।
জেলা প্রশাসকের অনুরোধে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ায় আটকে থাকা ৪১টি কনটেইনারের আদা বাজারে আসে, যা শুধু চট্টগ্রামেই নয়, সারা দেশের বাজারে আদার দাম কমিয়ে স্বস্তি ফেরায়।
কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের কমান্ডার আবু নেছার সালেহ আহমেদ এবং আনসার ও ভিডিপির প্রতিনিধি ইসমাইল হোসেনও এই জনস্বার্থমূলক উদ্যোগে জেলা প্রশাসনের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আবু হায়দার বলেন, ভালো কাজের এই স্বীকৃতি ব্যবসায়ীদের আরও উৎসাহিত করবে। চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় সুপারমার্কেটগুলোর প্রতিনিধিরা জানান, তারা কোরবানি-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৮৭টি পণ্যে ৫ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দিয়েছিলেন, যা সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, ক্ষমতা কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে কোনো ব্যবস্থা দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। একটি সংস্কৃতি তখনই টিকে থাকে, যখন মানুষ সেটিকে মূল্যবোধ দিয়ে ধারণ করে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, তারা কোনো সিন্ডিকেট সংস্কৃতির প্রতিনিধি নন, বরং তারা মূল্যবোধ ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন। উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও উৎসবের সময়ে মূল্যছাড়ের এই সংস্কৃতিকে তিনি একটি স্থায়ী সামাজিক দর্শনে রূপ দিতে চান।
অনুষ্ঠানের শেষ অংশে ‘ফেস্টিভ সেল’ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নে বিশেষ অবদান রাখায় ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।


