মোহাম্মদ সুমনকে আবহাওয়া প্রতিবেদন থেকে জানার প্রয়োজন নেই যে, পরিস্থিতি বদলে গেছে। তিনি সেটি অনুভব করেন তার গোড়ালির চারপাশে ধূসর ও কাদা মিশ্রিত পানিতে।
৫০ বছর বয়সী সুমনকে শনিবারের পুরো বিকাল কাটাতে হয়েছে তার বাসার রুমে ঢুকে পড়া পানি সরাতে। চট্টগ্রামের বাদুরতলা এলাকার এই দুর্গতি তার জীবনে বড় ধাক্কা দেয়।
সুমন বলেন, ‘পানি তো শেষমেষ চলে যায়। কিন্তু আসবাবপত্রে লেগে থাকা তৈলাক্ততা এবং পানির ট্যাঙ্কে ময়লা থেকে যায়।’ তিনি বলেন, রোগ আর ভয় সেটা কখনো যায় না।’
সুমন জানান, তিনি চট্টগ্রামের হাজার হাজার পানিবন্দির মধ্যে একজন।
গত ২৮ এপ্রিল অবিরাম বৃষ্টির পর চট্টগ্রাম শহরের গতি ক্রমশ ধীর হয়ে যায়। মুরাদপুর, ষোলশহর, প্রবর্তক ক্রসিং এবং চকবাজার স্থবির হয়ে পড়ে।
যেখানে এয়ার কন্ডিশনড অফিসে থাকা কর্তৃপক্ষ যখন সংকটের সঠিক নাম নিয়ে বিতর্ক করছে, তখন শহরের দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের জীবিকার ধ্বংসাবশেষ সরাতে ব্যস্ত।
শব্দের লড়াই: ‘পানি জমা’ বনাম ‘প্রলয়’
ক্ষমতার কক্ষে এই সংকটকে শুধুমাত্র শব্দের লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে প্রকাশ্যে অনুশোচনা জানিয়েছেন। তবে স্থানীয় সরকার উপমন্ত্রী মীর শাহ আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, এটি “পানি জমা” নয়, বরং “প্রলয়।”
৬০ বছর বয়সী ঝিনুক পাল। যিনি সম্প্রতি পানি থেকে বাঁচতে চকবাজারে তার বাড়ির সামনে দুই ফুট উঁচু কংক্রিটের দেওয়াল তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, ‘এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বৃষ্টি আমাদের শত্রু। আমরা বাড়ির ভেতরে দেওয়াল তৈরি করছি শুধু বাঁচার জন্য। তারা কি নাম দিচ্ছে তা আমরা পরোয়া করি না, বরং আমরা দেখি, প্রতিটি কালো মেঘই ভয় সৃষ্টি করে।’
১৪ হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন
চট্টগ্রাম শহরকে রক্ষা করার জন্য তিনটি বড় প্রকল্প চলছে, যেখানে বরাদ্দ হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। শহর প্রধানত কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্ভরশীল, যা বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত।
শহরের ৫৭টি খাল খনন, সংস্কার এবং শক্তিশালীকরণের কাজ চলছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ৩৬টি খালের কাজ দেখছে, আর সিটি করপোরেশন বাকি ২১টির দায়িত্বে আছে।
তবুও, নিষ্কাশন নেটওয়ার্ক এখনো বন্ধ রয়েছে। মেয়র শাহাদাত হোসেন স্বীকার করেছেন, চ্যালেঞ্জ বড়। সাত মিলিয়ন জনসংখ্যার শহরে খালের বাইরে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক ড্রেন রয়েছে, যার বেশিরভাগ প্লাস্টিক বর্জ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘প্রকৌশল একমাত্র যুদ্ধ নয়। বর্জ্য ফেলার অভ্যাস এবং পাহাড় থেকে আসা মাটি এমন একটি জট তৈরি করে, যা টাকা দিয়ে সমাধান করা যায় না।’
সমুদ্রের সঙ্গেই লড়াই
চট্টগ্রামের দুর্বলতা এর ভৌগলিক অবস্থান। শহরের বেশিরভাগ অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২–৪ মিটার ওপরে, যা সমুদ্রস্তর বৃদ্ধির সঙ্গে ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের জলস্তর বছরে আনুমানিক ৪ দশমিক ৭৩ মিলিমিটার হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারী বৃষ্টি ও উচ্চ জোয়ার একসঙ্গে হলে নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যত উল্টো হয়ে যায়।
প্রকৌশলী সুবাশ বড়ুয়া টাইমসকে বলেন, ‘সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক করার পরিবর্তে, আমাদের এই মেগা-প্রকল্পগুলোর ফরেনসিক পর্যালোচনা দরকার।’
তিনি বলেন, ‘দোকানদারের মালামাল ত্রিশ মিনিটেই নষ্ট হলে তিন ঘণ্টায় পানি নামা কি সাফল্য?’
অগণিত ক্ষতি
সরকারি তথ্যে এখনো ক্ষতির পরিমাণ অধিকাংশ সময়ে সঠিকভাবে প্রকাশ করা হয় না। বাদুরতলার মোটর গ্যারেজ মালিক নেজাম উদ্দিন জানান, তার মোটর গ্যারেজে বন্যার পানি প্রবেশ করে। এতে গ্যারেজের সরঞ্জাম ও গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট হয়। সেইসঙ্গে তার আয় এক সপ্তাহ বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘ধনীদের জন্য বৃষ্টি ঋতু, আমাদের জন্য হুমকি।’
এমন হাজার হাজার মানুষের সম্মিলিত ক্ষতি মাপার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান স্বীকার করেছেন,‘কয়েক হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ যদিও বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি।
২০২৬ সালের বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গে, বাসিন্দারা একটি বাড়তে থাকা সমুদ্র এবং ধীরগতির আমলাতন্ত্রের মধ্যে ফেঁসে যাচ্ছেন। যদি ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ না হয়, তাহলে চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক শক্তি থেকে দুর্বল নগরীতে পরিণত হতে পারে।


