চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ পুরোপুরি শেষ হবে বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী।
এক মতবিনিময় সভায় মঙ্গলবার দুপুরে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহসিন এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘গত ৫ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে ৫৪৬ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে, যা ১৯৮৩ সালের পর গত ৪৩ বছরে সর্বোচ্চ। যেটার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না।’
প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘তাদের ড্রেনেজ মডেল ৫৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি সামলাতে সক্ষম। এত বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পরও শহরের হাতেগোনা ৪-৫টি পয়েন্ট ছাড়া কোথাও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা হয়নি এবং জমে থাকা পানি এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে নেমে যাবে। এটাকে আমরা জলাবদ্ধতা বলতে চাই না।’
২০২৩ সালে শহরের ১২১টি জলাবদ্ধতার পয়েন্টে পানি নিষ্কাসন হতে ৩৫-৩৬ ঘণ্টা সময় লাগতো জানিয়ে মো. মহসিন বলেন, ‘আমাদের কাজ শুরু হলে এই পয়েন্ট ২০২৪ সালে ৬১টি এবং ২০২৫ সালে ১৭টিতে নেমে আসে। বর্তমানে চার থেকে পাঁচটি জায়গায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে। গত ২৮ এপ্রিলের পরে মঙ্গলবার পর্যন্ত তিনটি জায়গাতে হালকা জলাবদ্ধতা দেখেছিলাম। ওই জায়গাগুলো নিচু হওয়ায় সিটি কর্পোরেশন দুই ইঞ্চি উঁচু করে দিচ্ছে। উঁচু হলে কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা এলাকায় আর পানি উঠবে না।’
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মহসিন জানান, হিজড়া খালের কাজ বাকি আছে। এ ছাড়া প্রকল্পের ছয়টি খালের মধ্যে পাঁচটির কাজ দুই শতাংশ পর্যন্ত বাকি রয়েছে। প্রকল্পের সার্বিক কাজ এখন পর্যন্ত ৯৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ শেষ করতে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে মোবিলাইজেশন শুরু হবে এবং অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে রিটেনিং ওয়াল ও তিনটি ব্রিজের কাজ শেষ করা হবে।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরে ছোট বড় প্রায় ১৩০টি খাল আছে। বাকি খালগুলো নিয়ে সিটি কর্পোরেশন দ্বিতীয় ধাপে প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ওগুলো যদি হয়ে যায় বাকি ২০ শতাংশ জলাবদ্ধতাও সমাধান হয়ে যাবে।’
প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে (চসিক) দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী আগামী এক থেকে দুই বছর সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে যৌথভাবে খালগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করবে এবং তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞান ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেবে। এরপর থেকে চসিক নিজেরাই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে।’
খালগুলো পুনর্দখল রোধে প্রকল্পের আওতায় রিটেনিং ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে, যা খালের সীমানা স্থায়ীভাবে সুনির্দিষ্ট করেছে। এ ছাড়া খালের ময়লা পরিষ্কারের সুবিধার্থে আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন এক্সকভেটর বা ডাম্পার চলাচলের জন্য খালের পাশে সার্ভিস রোড তৈরি করা হচ্ছে। এই রাস্তার পাশে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে বনায়ন করা হবে, যাতে নগরবাসী সেখানে বিকেলে হাঁটাহাঁটি করতে পারেন এবং শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘একটি পুরনো শহরের ভেতরে যে খাল বা ড্রেনগুলো থাকে সেগুলো কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায়। একটা পরিপূর্ণ শহরের মাঝখানে যখন খাল খনন করে বা বৃদ্ধি করে, ভবন ভেঙে, জনগণের সঙ্গে সমঝোতা করে পৈত্রিক জমি বুঝিয়ে নিয়ে যখন কাজ করতে যাব এই চ্যালেঞ্জ প্রকল্প যখন বাস্তবায়ন করার আগে পরিকল্পনা করেছে, সেই পরিকল্পনা কমিটি হয়তো ওভাবে চিন্তা করেনি। কাজ করতে গিয়ে দেখা যায় সেভাবে সম্ভব নয়। ঠিক সেই কারণেই সিটি কর্পোরেশন কাজটা নিজে না করে সেনাবাহিনীকে দিয়েছে। হয়তো উনারা মনে করেছে এই কাজ সেনাবাহিনীর পক্ষে করা সহজ হবে।’
কাজ করতে গিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বৈধ অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ এবং ভূমি অধিগ্রহণের মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে জানিয়ে মো. মহসিন বলেন, ‘যেই জায়গাগুলো আমরা রিকভার করেছি, সেখানে খালের অংশে রিটেইনিং ওয়াল করে দিয়েছি। সেই অংশ পুনর্দখল করার সুযোগ নাই। যেই জায়গাগুলোতে জনগণের চলাচলের অবস্থা আছে সেগুলোকে রিটেনিং ওয়াল করে দিয়েছি যেন নিরাপদ থাকে। খাল পরিষ্কারের জন্য যে যন্ত্রপাতি নিতে হবে সেগুলোকে খাল পর্যন্ত নেয়া এবং খাল থেকে ময়লা পরিষ্কার করার জন্য আমরা রাস্তা করে দিচ্ছি। সেটাকে বলা হচ্ছে সার্ভিস লেন। অবশিষ্ট জায়গায় আমরা বৃক্ষরোপণ করে দিচ্ছি। এতে এগুলো অনেকটা পার্কের মতো হবে।’
মতবিনিময় সভায় আরও জানানো হয়, অতিবৃষ্টির প্রভাব মোকাবিলায় বর্তমানে ১৬টি জায়গায় কুইক রিঅ্যাকশন টিম ছয়জন করে সদস্য নিয়ে মাঠে কাজ করছে। প্রকল্প পরিচালক আশা করেন, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ পুরোপুরি শেষ হলে চট্টগ্রামবাসী জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে অনেকাংশেই মুক্তি পাবে।


