জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা আর সামাজিক স্তরের নারীরা। মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া থেকে শুরু করে স্লোগানে-সংগ্রামে সামনের সারিতেই ছিলেন তারা।
সে সময় ধারণা করা হয়েছিল, অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য জমা পড়া মনোনয়নপত্রের তালিকা সেই প্রত্যাশার উল্টো চিত্র তুলে ধরছে।
এবার মোট ১১০টি আসনে মাত্র ১০৮ জন নারী প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। যা মোট আবেদনের মাত্র ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ।
এর তুলনায় ২০২৪ সালের নির্বাচনে বরং নারীর অংশগ্রহণ বেশি ছিল। সেবার অর্থাৎদ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ২ হাজার ৭১৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৩৩ জন ছিলেন নারী। অর্থাৎ সেবার নারী প্রার্থীর হার ছিল ৪ দশমিক ৯০ শতাংশ।
দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। এ ছাড়া আনুমানিক ৬ কোটি ৩০ লাখ নারী ভোটারের বিরাট শক্তি থাকার পরেও মনোনয়ন নিতে আগ্রহী বা নির্বাচন লড়তে আগ্রহী নারীর এই সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য।
রাজনৈতিক নেতা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নতুন অনেক নারীকে রাজনীতিতে অনুপ্রাণিত করেছিল। কিন্তু বর্তমানে রাজনীতিতে নারীর যে অংশগ্রহণের চিত্র তা গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত বাধাকেই দায়ী করেন তারা।
তবে অভ্যুত্থানের পর যে পরিবর্তনটির কথা বলতেই হয়, সেটি হলো রাজনীতির মাঠে নির্দলীয় নারী প্রার্থীদের উত্থান। আগে যেখানে দলীয় মনোনয়নই বেশিরভাগ নারীরা চাইতেন সেখানে এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সর্বোচ্চ ৪০ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অর্থাৎ নারী প্রার্থীরা ঐতিহ্যবাহী দলীয় কাঠামোর ভেতরে প্রতিযোগিতা করার চেয়ে বাইরে থেকে লড়াই করাকেই প্রাধান্য নিচ্ছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘দলের সমর্থন ছাড়া নির্বাচনে জয় পাওয়া অত্যন্ত কঠিন, বিশেষ করে নারীদের জন্য। যতক্ষণ না নারীদের দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা এই একই ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তি দেখতে থাকব।’
তিনি নেপালের মতো আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার পরামর্শ দেন। তবে বাংলাদেশের দলগুলোর এ নিয়ে অনাগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন।
আগামী নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির সাবেক এমপি রুমিন ফারহানা। যিনি জোটের রাজনীতির কারণে দলের মনোনয়ন না পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে লড়ছেন।
এছাড়া ঢাকা-৯ আসনে এনসিপির সাবেক নেত্রী তাসনিম জারাও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তার দলের জোটের প্রতিবাদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
মনোনয়ন তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপি ১০ জন নারী প্রার্থী দিয়েছে, যা বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী)-র সমান। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। বাসদ চারজন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল প্রত্যেকে ছয় জন করে নারী প্রার্থী দিয়েছে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলও ছয় জন এবং জাতীয় পার্টি (জাপা) ছয় জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। এছাড়া এবি পার্টি তিন জন এবং গণসংহতি আন্দোলন চার জন নারী প্রার্থী দিয়েছে। গণ অধিকার পরিষদ দিয়েছে তিন নারী প্রার্থীদ।
এর আগে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৬৮ জন এবং ২০২৪ সালের (দ্বাদশ) নির্বাচনে ৯৬ জন নারী সাধারণ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
পেশায় ব্যবসা ও গৃহিণীদের আধিপত্য
আসন্ন নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের প্রধান পেশা হিসেবে ব্যবসা ও গৃহস্থালি কাজ সামনে এসেছে।
২০ জন প্রার্থী এই দুটিকে তাদের প্রধান পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। গৃহিণী হিসেবে তালিকাভুক্তদের মধ্যে একজন ইন্টার্ন আইনজীবী, একজন সাবেক বেসরকারি চাকরিজীবী এবং একজন কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
অন্যান্য পেশার মধ্যে আইন পেশায় আটজন, কৃষিতে তিনজন এবং শিক্ষার্থী রয়েছেন চারজন।
ভৌগোলিকভাবে এবারের ভোটযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ শহরকেন্দ্রিক। ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৩৯ জন প্রার্থী লড়ছেন, এরপর চট্টগ্রামে ২০ জন, রাজশাহীতে ১৩ জন এবং খুলনায় ১০ জন।
আসনভিত্তিক হিসেবে চট্টগ্রাম-১০ আসনে সর্বোচ্চ ১০ জন নারী প্রার্থী রয়েছেন।
অন্যদিকে গাইবান্ধা, ঝিনাইদহ ও নাটোরসহ বেশ কিছু জেলায় মাত্র একজন করে নারী প্রার্থী রয়েছেন।
আর্থিক বৈষম্য
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী নারী প্রার্থীদের মধ্যে বেশ ভালো পরিমাণে আর্থিক বৈষম্য দেখা গেছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী মোসাম্মৎ আশা মনির বার্ষিক আয় সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা যেমন রয়েছে তেমনি জাতীয় পার্টির মেহেরুন নেসা খানের বার্ষিক আয় সর্বোচ্চ ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকাও রয়েছে। সম্পদের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশাল ব্যবধান।
ইনসানিয়াত বিপ্লবের তাহমিনা আক্তারের সম্পদ মাত্র ৫০ হাজার টাকা হলেও বিএনপির আফরোজা খানম রিতার সম্পদ ২৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
এ ছাড়া ঋণের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাপসী তন্ময় চৌধুরীর ১৪০ কোটি ২৩ লাখ টাকার ব্যবসায়িক ঋণ রয়েছে। আটজন প্রার্থী তাদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলার কথা উল্লেখ করেছেন।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, নারীরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-এর অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিলেও পরে তাদের একপাশে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ নারীরা সরাসরি নির্বাচিত না হবেন, ততক্ষণ তারা নীতি নির্ধারণ বা সংসদীয় সিদ্ধান্তে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন না।’
তিনি দলগুলোকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ নারী কোটা পূরণের আহ্বান জানান। যে নিয়মটি দলগুলো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে উপক্ষো করে যায়।


