গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া তারেক রহমান চলতি মাসের শেষের দিকে তার প্রথম বিদেশ সফর করবেন। আগামী ২১-২২ জুন তিনি মালয়েশিয়া এবং ২৩-২৫ জুন চীন সফর করবেন।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের আগে মালয়েশিয়া সফরের এই সূচিতে অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ, শ্রম অভিবাসন, নিয়োগের খরচ এবং বৈধ কর্মসংস্থানের মাধ্যমের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মালয়েশিয়ায় প্রায় আট লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন, যা দেশটির মোট বিদেশি শ্রমশক্তির প্রায় ৩৭ শতাংশ। তারা মূলত উৎপাদন, নির্মাণ, প্ল্যান্টেশন এবং কৃষি খাতে কর্মরত।
এরপর বেইজিং সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য শক্তি, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে নতুন বিনিয়োগের সন্ধান করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ শাকিল ভূঁইয়া বলেন, ‘ঢাকা হয়ত আরও সহজ শর্তে অর্থায়নের অনুরোধ করতে পারে এবং স্থবির হয়ে পড়া কিছু প্রকল্প পুনরায় সচল করার চেষ্টা করতে পারে।’
বিশ্লেষকদের মতে, সফরের এই ধারাবাহিকতা একটি সুচিন্তিত ‘আগে বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশ ফার্স্ট) নীতির প্রতিফলন, যার উদ্দেশ্য হলো শুরুতেই ভারত বা চীনের কোনো একটির দিকে ঝুঁকে পড়া এড়ানো।
ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন ও আসিয়ানের ওপর জোর
সীমান্ত উত্তেজনা, অমীমাংসিত তিস্তা বা অন্যান্য নদীর পানি বণ্টন সমস্যা এবং ২০২৪ সালে গণবিক্ষোভের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতির কারণে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কে এক ধরনের আস্থার সংকট ও টানাপোড়েন চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটি স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাফি মো. মোস্তফা বলেন, ‘এই সফরগুলোর মাধ্যমে সরকার বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দেশ হিসেবে এবং বৈচিত্র্যময় অংশীদারত্বের ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।’ তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর মানে এই নয় যে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে।
তিনি বলেন, ‘যেকোনো ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য ভারত এতটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী যে তাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব।’
শাফির মতে, মালয়েশিয়া সফরের একটি প্রধান লক্ষ্য হবে আসিয়ানের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা; বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তানের কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে সার্কের অগ্রগতি থমকে থাকায় এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও যোগ করেন, বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত শিল্প উন্নয়নের সুযোগগুলো স্থান পেতে পারে।
দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’-এর অ্যাসোসিয়েট ফেলো সোহিনী বোস মালয়েশিয়াকে প্রথম সফরের দেশ হিসেবে বেছে নেওয়াকে একটি “বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত” বলে বর্ণনা করেছেন, যা ঢাকাকে কোনো ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের জল্পনা-কল্পনা এড়াতে সাহায্য করবে।
তিনি বলেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের গত বছর সফরের সময় হওয়া চুক্তিগুলো তারেক রহমানের সফরেও গুরুত্ব পাবে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা এবং চীনে চট্টগ্রামের ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ উন্নয়ন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মোংলা বন্দরের আধুনিকীকরণের বিষয়গুলো এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সোহিনী উল্লেখ করেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে বাংলাদেশ এ বছরের শুরুতে ডিজেল সরবরাহের জন্য দিল্লির দ্বারস্থ হয়েছিল, যা প্রমাণ করে ঢাকা একটি স্থিতিশীল সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝে।
তিনি বলেন, “উভয় পক্ষই বাস্তবসম্মতভাবে বোঝে যে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক পুনর্গঠন করা একটি অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।”
অভ্যন্তরীণ স্বাভাবিকতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং চীনের ঋণ
সিঙ্গাপুরভিত্তিক সোলারিস স্ট্র্যাটেজিসের সিনিয়র আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক মোস্তফা ইজ্জুদ্দিনের মতে, এই আসন্ন সফরগুলোর উদ্দেশ্য হলো বিশ্বকে এই বার্তা দেওয়া যে, শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাসের অস্থিরতা কাটিয়ে বাংলাদেশে এখন “অভ্যন্তরীণ স্বাভাবিকতা” ফিরে এসেছে।
তিনি বলেন, “কৌশলগত উদ্দেশ্য হলো যেসব দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঢাকা আসিয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে “সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার” স্ট্যাটাস চাইছে, যা পূর্ণ সদস্যপদ ছাড়াই সুনির্দিষ্ট নীতিগত ক্ষেত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেবে।
ইন্দোনেশিয়ার ইসলামিক ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং প্রফেসর মোস্তফা আরও যোগ করেন, বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র, কারণ ঢাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের আগে অন্য দেশ সফরের কারণে দিল্লির যেকোনো উদ্বেগের পেছনে রয়েছে ‘চীনভীতি এবং প্রভাব হারানোর আশঙ্কা’ উল্লেখ করে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহাম্মদ শাকিল ভূঁইয়া বলেন, গত মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরই প্রমাণ করে যে ঢাকা একটি মর্যাদাপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চায়।
তিনি বলেন, এই সফরগুলো “প্রচলিত চীন-ভারত দ্বিমুখী সমীকরণের বাইরে মনোযোগ সরিয়ে নেয় এবং বিষয়গুলোকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল হতে দেয় না।”
সীমান্ত ও অভিবাসন সংক্রান্ত বিরোধ এখনো সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে, যার প্রধান কারণ নথিপত্রহীন সীমান্ত পারাপার এবং ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দ্বারা জোরপূর্বক পুশব্যাক বা প্রত্যর্পণের অভিযোগ। দিল্লি এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য মনে করলেও, ঢাকা জোর দিয়ে বলছে যে যেকোনো ধরনের পুশব্যাক জোরপূর্বক না করে আনুষ্ঠানিক যাচাইকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রভাষক ও কৌশলগত বিষয়ক বিশ্লেষক মো. হিমেল রহমান বলেন, ঢাকা সম্ভবত মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর জন্য চাপ দেবে এবং রোহিঙ্গা সংকটে কূটনৈতিক সমর্থন চাইবে।
হিমেল বলেন, “শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হতে পারে;” বিশেষ করে গত বছরের জুনে শোষণ ও মানবপাচার রোধে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ স্থগিত করার পর এটি বেশ জরুরি।
মালয়েশিয়ায় বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি মর্যাদা ছাড়াই প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ কক্সবাজারে ১০ লাখেরও বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, যা একটি বড় আর্থিক বোঝা তৈরি করেছে। এই মানবেতর পরিস্থিতি অনেক শরণার্থীকে মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়তে বাধ্য করছে।
হিমেল আরও যোগ করেন, ২০২৯ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাই চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পাশাপাশি আরও বেশি চীনা বিনিয়োগ ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া ঢাকার জন্য জরুরি হবে।
‘প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়ে ঢাকা দুটি বার্তা দিচ্ছে,’ বলেন হিমেল।
তার মতে, একটি বার্তা দেশের অভ্যন্তরীণ জনগণের জন্য, যা ‘আগে বাংলাদেশ’ নীতি প্রদর্শন করে এবং অন্য বার্তাটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য, যা স্পষ্ট করে যে ভারত ও চীনের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ বেছে নিতে রাজী নয়।


