চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে এজাজ আহমেদ এমন একটি মরদেহের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, যার সেখানে থাকার কথা ছিল না। বৃহস্পতিবার বিকালে এই মুদি দোকানি তার ১১ বছর বয়সী ছোট বোন রেশমিকে শেষবারের মতো বাড়ি নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
খুব সাধারণ প্রয়োজনে শুরু হয়েছিল এই ট্র্যাজেডি। গত ৭ মে বন্দর নগরীর রউফাবাদ বিহারী কলোনির বাসা থেকে পান কিনতে বেরিয়েছিল রেশমি। কিন্তু সে আর অক্ষত অবস্থায় ফিরতে পারেনি। প্রতিবেশী এক ব্যক্তির বাসায় রাউজান থেকে আসা হাসান রাজু নামের এক যুবকের ওপর হামলার সময় দুই পক্ষের গোলাগুলির মাঝে পড়ে যায় সে। হাসান রাজু নিজেও একজন তালিকাভুক্ত অপরাধী। সেই হামলার সময় একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট বুলেট রেশমির বাম চোখ দিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়। টানা আট দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ১১ বছর আগে যে হাসপাতালে রেশমির জন্ম হয়েছিল, সেখানেই সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে।
কান্নায় ভেঙে পড়া এজাজ বলেন, ‘আমরা এখন শুধু আমার বোনের হত্যার বিচার চাই।’
রেশমির এই মৃত্যু চট্টগ্রামে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শহরটি এখন টার্গেট কিলিং এবং গ্যাং কালচারের কবলে পড়েছে। এই অপরাধ জগৎ এখন আর কেবল অপরাধীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশের এই ব্যস্ত বন্দর নগরীতে সশস্ত্র সহিংসতা এখন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া শিশু–সবার জীবনেই অন্ধকারের ছায়া ফেলছে।
সহিংসতার এই ভৌগোলিক বিস্তার এখন উদ্বেগজনকভাবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে রেশমি গুলিবিদ্ধ হয়েছিল, তার ঠিক কাছেই গত বছরের শেষের দিকে বহদ্দারহাটে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালীন এলোপাতাড়ি গুলিতে আহত হন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ। আবার চকবাজারের চন্দনপুরায় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের বাড়িতে চাঁদাবাজির হুমকির মুখে দিনের আলোতেই গুলিবর্ষণ করা হয়।
এগুলো শহরের কোনো নির্জন কোণে ঘটা ঘটনা নয়, বরং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অত্যন্ত দুঃসাহসিকতার সাথে চালানো হামলা।
চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রায় ৭০ লাখ মানুষের জন্য এখন সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় হলো, এমন সহিংসতা যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হচ্ছে। অধিকাংশ হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু থাকলেও রেশমির ক্ষেত্রে তা ছিল না। অপরাধ জগতের সাথে কোনো সম্পর্কহীন এক শিশু শিক্ষার্থীর মৃত্যু এই রূঢ় সত্যকে সামনে এনেছে যে, চট্টগ্রামে এখন কেউই লক্ষ্যভ্রষ্ট বুলেটের আওতার বাইরে নয়।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম জুড়ে সহিংসতায় ২৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। পুলিশের ভাষ্যমতে, এই রক্তপাতের বড় অংশই ঘটছে সুসংগঠিত অপরাধী চক্রের মাধ্যমে, যাদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। এই গোষ্ঠীগুলো চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড় এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে তাদের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে। হামলার পর তারা সহজেই পাহাড়ি এলাকায় হারিয়ে যায় এবং পুনরায় হামলার প্রস্তুতি নেয়।
রেশমির হত্যাকাণ্ড এই সহিংসতার ভয়াবহতাকেই তুলে ধরেছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসানুজ্জামান শওকত আলী জানান, রাউজানের একটি বিরোধের জেরে এই গোলাগুলির ঘটনা ঘটে, যা পরে শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও সামগ্রিক সংকট এখনো কাটেনি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরই মধ্যে ৩৩০ জন তালিকাভুক্ত অপরাধীকে মহানগর এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এমনকি সশস্ত্র অপরাধীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
তবে এত কঠোর পদক্ষেপের পরও কেন অপরাধী গোষ্ঠীগুলো এত আত্মবিশ্বাসের সাথে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৩ মে পর্যন্ত ১০০টি অস্ত্র মামলায় ২০৯ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে সিএমপি। অভিযানে ৩০টি দেশি বন্দুক, ৪৫টি পিস্তল, ৫টি রিভলভার, একটি এসএমজি, ১০টি রাইফেল এবং ৭০০ রাউন্ডেরও বেশি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে জেলা পুলিশ আরও শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে কিছু অস্ত্র এই অঞ্চলের জন্য একেবারেই নজিরবিহীন।
সিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মোহাম্মদ রাসেল জানান, উদ্ধারকৃত কিছু অস্ত্র এতটাই আধুনিক যে সেগুলোর উৎস দেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে সাবমেশিন গানের আদলে তৈরি অত্যাধুনিক সিংগেল ব্যারেল আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অস্ত্র পাচারকারী চক্রের সক্রিয়তার আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামের ঘন জঙ্গল, পাহাড় এবং উপকূলীয় পথগুলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজের পরিধিকে সীমিত করে দেয়। এই ভূ-প্রকৃতি অপরাধী ও পাচারকারীদের জন্য নিরাপদ পালানোর পথ এবং লুকানোর জায়গা হিসেবে কাজ করে। সিএমপি কমিশনার স্বীকার করেন, বর্তমানের সংগঠিত অপরাধ দমনে প্রথাগত পুলিশিং আর যথেষ্ট নয়। তিনি অপরাধ দমনে প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীদের হাতে র্যাব সদস্য নিহতের ঘটনার পর সেনাবাহিনী, র্যাব এবং পুলিশের প্রায় ৪ হাজার সদস্যের এক যৌথ বাহিনী দিনভর চিরুনি অভিযান চালায়। তবে এত কিছুর পরও রাজনৈতিক নেতারা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, অপরাধের ভয়াবহতা পুলিশি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তিনি মনে করেন, অপরাধীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই এবং বিচার নিশ্চিত করতে কোনো শৈথিল্য থাকা উচিত নয়।
একইভাবে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মুহাম্মদ নুরুল আমিন সতর্ক করে বলেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ঈদুল আজহার আগে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। শান্তি ফেরাতে সব দলের সহযোগিতা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।


