অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, সেন্সরশিপ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় তাদের ব্যর্থতা প্রকাশ পেয়েছে। এর ফলে ফুটে উঠেছে সরকারের বড় বড় প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ব্যবধান ।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ)-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। আরএসএফ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন শাসনামলে গণমাধ্যমের অধিকার খর্ব হওয়ার বিষয়টিকেই তুলে ধরেছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম—যা আগের বছরের ১৪৯তম অবস্থানের চেয়ে তিন ধাপ নিচে।
তথ্য অধিকার কর্মী রুহি নাজ ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-কে বলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিবাচক দাবিগুলো বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি মিলছে না। তিনি যুক্তি দেন, ওই সময়ে করা অনেক বক্তব্যই টেকসই বা যাচাইযোগ্য ছিল না। মাঠ পর্যায়ের ঘটনার সাথে তার কোনো মিল ছিল না। সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, আটক এবং চাপের মুখে রাখার আগের ঘটনাগুলো বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়েছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালকে সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতার সময় হিসেবে চিত্রিত করা ভিত্তিহীন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী দুই মাসে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো বড় ধরনের হয়রানির খবর তিনি পাননি। পরিস্থিতি আগের মতোই চলছে বলে মনে হচ্ছে, যেখানে উল্লেখ করার মতো উন্নতি বা অবনতির কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই। রুহি নাজ আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রায়ই অতিরঞ্জনের প্রবণতা দেখা গেছে, যা প্রকৃত পরিস্থিতি মূল্যায়নে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আরএসএফ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ১৭ কোটি মানুষের ২০ শতাংশের বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, যাদের মূলধারার গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকার সীমিত। প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়, শেখ হাসিনার পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ১৩০ জনেরও বেশি সাংবাদিক ভিত্তিহীন মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ‘হত্যা’ এবং ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’-এর মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে এবং অন্তত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাংবাদিকতা এখনো পুরুষশাসিত রয়ে গেছে। নারী সাংবাদিকরা কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও অনলাইনে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার শিকার হচ্ছেন। আইনি কাঠামোর বিষয়ে আরএসএফ জানায়, শেখ হাসিনা সরকার বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আদলে সাইবার নিরাপত্তা আইন প্রবর্তন করেছিল। এই দমনমূলক আইনটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, গ্রেপ্তার, সরঞ্জাম জব্দ এবং তথ্যের উৎসের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের সুযোগ করে দিয়েছিল। অনেক সময় সম্পাদকরা স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ করতে বাধ্য হতেন।
অন্যদিকে, গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন গণমাধ্যমগুলো সম্পাদকীয় স্বাধীনতার চেয়ে সরকারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রভাব বিস্তার ও মুনাফার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতো।
অন্তর্বর্তী সরকারের দাবি নিয়ে বিশ্লেষকদের দ্বিমত
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বারবার দাবি সত্ত্বেও বিশ্লেষকরা বাস্তবতার সাথে কোনো মিল দেখতে পাননি। তৎকালীন প্রেস সচিব শফিকুল আলম ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ‘অভূতপূর্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা’ ভোগ করছে এবং সরকার কাউকে চুপ করিয়ে দিতে দমনমূলক আইন ব্যবহার করেনি।
৫ জুলাই তিনি দাবি করেন, সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় ‘কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি’ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করাকে একটি বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, একটি ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন’ বিবেচনাধীন রয়েছে, যা পাঁচ মাস পরেও ঝুলে ছিল। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা হস্তান্তরের ঠিক আগে তিনি ১৮ মাসের সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘সবচেয়ে বড় সংস্কার’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তবে বাস্তবে সংবাদকর্মীরা অব্যাহত চাপ ও অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়েছেন। গ্রেপ্তার, দীর্ঘ সময় জামিন না পাওয়া, মালিকানা পরিবর্তন এবং ব্যাপক স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই গেছে। সাংবাদিকরা বারবার ওয়েজ বোর্ড ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়া, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, চাকরির স্থায়িত্বের অভাব এবং পেশাগত নিরাপত্তার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন।
বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের তিন ধাপ পিছিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে শফিকুল আলম টাইমসকে বলেন, তিনি এখন আর সরকারে নেই। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না।
একটি বেসরকারি গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আকবর সুমন বলেন, আগের সরকারের মতো অন্তর্বর্তীকালেও সমালোচনামূলক অবস্থান নেওয়া সাংবাদিকরা ‘মব’ বা উচ্ছৃঙ্খল মানুষের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তিনি আরও যোগ করেন, কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগগুলো কাজে লাগানো হয়নি এবং কমিশনগুলো কেবল প্রস্তাবনা তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলাদেশে বিবিসি বা আল জাজিরার মতো স্বাধীন পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। দুর্বল আইন, রাজনৈতিক চাপ এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
মামলা, আটক ও নিরাপত্তাহীনতায় সাংবাদিকরা
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অনেকাংশেই মালিকদের ওপর নির্ভর করে। গত ১৫ বছরে কিছু মালিক সরকারের তোষামোদ করে সুবিধা নিয়েছেন, কিন্তু পটপরিবর্তনের পর অনেকে মামলা বা নির্বাসনের মুখে পড়েছেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সময়ে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো দায়বদ্ধতা এড়াতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ চর্চা করেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচিত সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সাজ্জাদ আলম খান তপু বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি ‘ভীতিজনক পরিবেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে এবং অনেকে বিচার ছাড়াই কারাগারে রয়েছেন। দেড় থেকে দুই বছর পার হয়ে গেলেও তদন্ত শেষ হয়নি এবং জামিনও দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, “এর পাশাপাশি গণমাধ্যম দখল, চাকরিচ্যুতি, প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ বাতিল এবং অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করার মতো ঘটনাগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতার পথকে সংকুচিত করেছে।”
অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি জানান, ওয়েজ বোর্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। টেলিভিশন খাতে নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো না থাকায় চরম বৈষম্য তৈরি হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তা বা আইনি সুরক্ষা নেই। মালিকরা যখন সম্পাদকীয় স্বাধীনতা খর্ব করেন, তখন সাংবাদিকদের সুরক্ষাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এবং আরএসএফ ৫ আগস্টের পর থেকে মামলার ধীরগতি এবং বারবার জামিন নামঞ্জুর হওয়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক দীর্ঘমেয়াদী কারাবাস, একাধিক মামলা এবং স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন।
ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্তকে ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের সীমান্ত এলাকা থেকে আটক করা হয়। তিনি এখনো কারাগারে আছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে অন্তত ছয়টি হত্যা মামলা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কারাগারে তার স্ট্রোক হয়েছিল, কিন্তু তার পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি এবং তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি।
একাত্তর টিভির সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাবুকেও শ্যামল দত্তের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়। একই প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপা এবং সাবেক বার্তা প্রধান শাকিল আহমেদকে ২১ আগস্ট বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়। রূপার বিরুদ্ধে নয়টি এবং শাকিলের বিরুদ্ধে আটটি হত্যা মামলা রয়েছে। রূপার ক্ষেত্রে এজাহার না পাওয়ায় পাঁচটি মামলায় জামিন আবেদন করা সম্ভব হয়নি। গত নভেম্বরে তাকে দুই সপ্তাহ ‘কনডেম সেলে’ রাখা হয়েছিল বলে জানা গেছে। আইনজীবীরা জানান, তাদের জামিন আবেদন ৩০ বারের বেশি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
মঞ্জুরুল আলম পান্নাকে ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বক্তব্য দেওয়ার পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭৫ দিন কারাগারে থাকার পর নভেম্বরে তিনি জামিন পান।
গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা সাংবাদিকদের আইনজীবী শ্যামল কান্তি সরকার বলেন, প্রায় ৬০০ দিন পার হয়ে গেলেও অনেক মামলায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হয়নি, যা ফৌজদারি কার্যবিধির লঙ্ঘন। তিনি যুক্তি দেন, সাধারণ অভিযোগের ভিত্তিতে সাংবাদিকদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হচ্ছে, যা ন্যা বিচারের স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিপিজে ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল বাংলাদেশের আইন মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি পাঠিয়ে আটক সাংবাদিকদের মুক্তির আহ্বান জানায়। এর আগে ৩ মার্চ কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন বলেছিল, “কয়েক ডজন সাংবাদিক এক বছরের বেশি সময় ধরে ভিত্তিহীন মামলায় কারাগারে আছেন,” যা গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।


