তৈরি পোশাক ও চাতাল শিল্পে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং ‘ন্যায্য রূপান্তর’ নিশ্চিতের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন বক্তারা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) তারা ক্লাইমেট লিমিটেডের সহযোগিতায় সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এবং চাতাল শিল্পে জলবায়ু পরিবর্তন এবং সবুজ ও ন্যায্য পরিবর্তনের বাস্তব অবস্থা ও প্রভাব বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
বিলস উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য মেসবাহউদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে সভায় অংশ নেন বিলস নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ, তারা ক্লাইমেট ফাউন্ডেশনের পরিচালক শওকত আরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং র্যাপিড নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর জাস্ট ট্রানজিশন টেকনিক্যাল অফিসার এলিসা বেনিস্টান্ত ফ্রেমিগাচি, সলিডারিটি সেন্টারের কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর একেএম নাসিম, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মো. তাকরিম হোসাইন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা মো মাসুম বিল্লাহ, আইবিসি সভাপতি কুতুব উদ্দিন আহমেদ, জি-স্কপ যুগ্ম সমন্বয়কারী আহসান হাবীব বুলবুল, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের মাহবুবুর রহমান, বিলস নির্বাহী পরিষদের সম্পাদক সাকিল আখতার চৌধুরী ও পরিচালক কোহিনুর মাহমুদ। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিলস উপপরিচালক গবেষণা মো. মনিরুল ইসলাম।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের গুণগত তথ্য বিশ্লেষণে উঠে আসে, দেশে আগে ছয় ঋতু স্পষ্ট থাকলেও বর্তমানে গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত-এই তিনটি ঋতুই বেশি দৃশ্যমান এবং গ্রীষ্মের সময়কাল দীর্ঘ হয়েছে। সবুজ জ্বালানি সম্পর্কে ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ শ্রমিক অজ্ঞ, মাত্র ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ এ বিষয়ে জানেন।
চাতাল শিল্পের ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধিরা বলেন, এ খাতে সবুজ জ্বালানির ব্যবহার নেই, যা অটো রাইস মিল মালিকরাও স্বীকার করেন। অন্যদিকে, তৈরি পোশাক খাতের কিছু কারখানায় সীমিত পরিসরে সৌরশক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ রয়েছে।
ন্যায্য রূপান্তর সম্পর্কে ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ শ্রমিক সম্পূর্ণ অপরিচিত, ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ জানেন। ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীরাও এ ধারণা সম্পর্কে যথাযথভাবে অবগত নন। পরিবেশ ও জলবায়ু অধিকার সুরক্ষায় ট্রেড ইউনিয়নের সক্ষমতা সম্পর্কে ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ শ্রমিক জানেন না, ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভালো সক্ষমতা রয়েছে বলে মনে করেন এবং প্রায় ১০ শতাংশ সক্ষমতা দুর্বল বলে মত দেন। চাতাল শিল্পে কার্যকর ট্রেড ইউনিয়ন না থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়।
গ্রিন ফ্যাক্টরি ও শ্রমিক অধিকারের দ্বন্দ্ব নিয়ে এম আবু ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক লিড সার্টিফায়েড গ্রিন ফ্যাক্টরি রয়েছে। তবে এই রূপান্তর কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের ওপর তিনি জোর দেন।
চাতাল শিল্পে অটোমেশনের প্রভাব নিয়ে একেএম নাসিম ও মাসুম বিল্লাহ বলেন, ৯৫ শতাংশ সনাতনী চাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজারো শ্রমিক বেকার হয়েছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন। বিকল্প কর্মসংস্থান ও কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
আইএলওর প্রতিনিধি এলিসা বেনিস্টান্ত ফ্রেমিগাচি বলেন, পরিবেশ মন্ত্রণালয় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করছে। রূপান্তর যেন কেবল সবুজে সীমাবদ্ধ না থেকে সবার জন্য ন্যায্য হয় এবং শ্রমিকের দক্ষতা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয়, সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
নারী শ্রমিকদের দ্বিগুণ ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে ট্রেড ইউনিয়ন নেত্রী সাহিদা পারভীন শিখা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নারী শ্রমিকদের ওপর বেশি পড়ে। ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রেও নারীরাই আগে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাই বিশেষ সুরক্ষা নীতি প্রয়োজন।
মাহবুবুর রহমান বলেন, শিল্পের স্থায়িত্বে শ্রমিক ও মালিকের সুসম্পর্ক অপরিহার্য। জি-স্কপ নেতা কাজী রুহুল আমিন অভিযোগ করেন, অনেক তথাকথিত গ্রিন ফ্যাক্টরিতেও শ্রমিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয় না এবং যাতায়াত সমস্যার কারণে হাজিরা বোনাস হারাতে হয়।
সিনিয়র ট্রেড ইউনিয়ন নেতা আব্দুল কাদের হাওলাদার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে এই গবেষণা একটি দলিল হিসেবে কাজ করবে।
সমাপনী বক্তব্যে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, সরকার ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। এই রূপান্তরে শ্রমিক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য ট্রেড ইউনিয়নকে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে।
বক্তারা একমত হন, জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত নয়, এটি একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সরকার, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই ন্যায্য রূপান্তর সম্ভব।
উল্লেখ্য, তৈরি পোশাক ও চাল প্রক্রিয়াকরণ শিল্প দেশে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেছে। এ দুই খাতে সবুজ পরিবর্তনের ন্যায্যতা নিশ্চিত ও শ্রমিক সংগঠনের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিলস তারা ক্লাইমেট লিমিটেডের সঙ্গে অংশীদারিত্বে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর অংশ হিসেবে ৪১৫ জন শ্রমিকসহ প্রায় ৫৫০ জন অংশীজনের অংশগ্রহণে পরিচালিত গবেষণার চূড়ান্ত ফলাফল এই সভায় উপস্থাপন করা হয়।


