গ্যাস সংকটে গত ১৭ মাস যাবত বন্ধ রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানার ইউরিয়া সার উৎপাদন। সরকারের রেশনিং পদ্ধতির গ্যাস সরবরাহের কারণে ২০১০ সালের পর থেকে বছরের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে কারখানাটি। ফলে সার উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হবার পাশাপাশি লোকসানের মুখে পড়ছে লাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি। কারখানা বন্ধ থাকায় প্রতিমাসে অন্তত ৮২ কোটি টাকার ৩৩ হাজার টন সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রতি টন সার ২৫ হাজার টাকা দামের হিসাবে গত ১৭ মাসে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার সাড়ে পাঁচ লাখ টন সার উৎপাদন ব্যহত হয়েছে।
এদিকে দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকায় মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে হাজার কোটি টাকার যন্ত্রাংশ। সেই সঙ্গে বাড়ছে আমদানি নির্ভরতা। এ অবস্থায় দ্রুত গ্যাস সরবরাহ দিয়ে কারখানাটি সচল রাখার পাশাপশি নতুন আরও একটি সার কারখানা স্থাপনের দাবী কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের।
কারখানার কারিগরি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৩ সাল থেকে বানিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হওয়া আশুগঞ্জ সার কারখানাটি ২০১০ সাল পর্যন্ত নিয়মিত প্রতিদিন ১৬‘শ টন উৎপাদন ক্ষমতা হিসাবে বছরে গড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদন হতো। গ্যাস সংকটে ২০১০ সাল থেকে দেশের সার কারখানাগুলোতে গ্যাস ব্যবহারে রেশনিং পদ্ধতি (সীমিত ব্যবহার) চালু করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
এরপর থেকে বছরের বেশিরভাগ সময় দেশের অন্যতম বৃহৎ আশুগঞ্জ সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের পহেলা মার্চ থেকে এই কারখানাটিতে গ্যাস সরবরাহ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। কারখানা শ্রমিক কর্মচারীরা জানান, রেশনিং পদ্ধতির কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কারখানার সামগ্রিক উৎপাদনে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় মূল্যবান যন্ত্রাংশের ত্রুটি দেখা দেওয়ার পাশাপাশি কমছে উৎপাদন ক্ষমতা। এতে লোকসানের পড়ছে মুখে লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি।
আশুগঞ্জ সার কারখানা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আবু কাউসার জানান, গ্যাস সংকটে টানা ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিআইসি)-এর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে কারখানাটি। এর মধ্যে ২৩-২৪ অর্থ বছরে এক লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪৮ হাজার মেট্টিক টন আর ২৪-২৫ অর্থ বছরে এক লাখ মেট্টিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাত্র সাড়ে ১৩ হাজার মেট্টিক টন ইউরিয়া উৎপাদনে সক্ষম হয় কারখানাটি। আর ২৫-২৬ অর্থবছরে দেড় লাখ মেট্টিক টন সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও গত ১৭ মাস যাবত একদিনের জন্যও উৎপাদনে যেতে পারেনি কারখানাটি। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কারখানাটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় দ্রুত গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি নতুন আরও একটি সার কারখানা স্থাপনের জন্য লিখিতভাবে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এই কারখানায় প্রতিদিন প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকা মূল্যের ১১‘শ টন সার উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। একই সাথে সারের চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে বিদেশ থেকে আমদানি করা সার দিয়ে। আশুগঞ্জ সার কারখানার উপ-মহাব্যাবস্থাপক (প্রশাসন) তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান দীর্ঘদিন যাবত কারখানাটি বন্ধ থাকায় মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার যন্ত্রাংশ। শ্রমিক কর্মচারীদের মাঝে ক্ষোভ এবং হতাশা বিরাজ করছে । গত কয়েক বছর যাবত নিজস্ব মুলধন থেকে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ভাতাসহ আনুষঙ্গিক খরচ মেটানো হচ্ছে।এভবে চলতে থাকলে এক বছরের মধ্যে কারখানার মুলধনও শুণ্যের কোটায় নেমে আসবে। উৎপাদনে সক্ষম কারখানাটি দ্রুত চালু করার জন্য গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি নতুন প্রকল্প গ্রহণে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে বার বার অবহিত করা হয়েছে।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লি. আশুগঞ্জ অঞ্চলের উপ-মহাব্যবস্থাপক-সঞ্চালন, প্রকৌশলী বাপ্পি হায়দার বলেন, ‘গ্যাস দেওয়ার বিষয়ে আমরা কোনো নির্দেশনা পাইনি। ওপরের মহল থেকে নির্দেশনা পেলে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হবে।
আশুগঞ্জ কারখানার উৎপাদিত সার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কুমিল্লা ও চাঁদপুরসহ আটটি জেলায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। সার আমদানী নির্ভরতা কমাতে এবং উক্ত অঞ্চলের কৃষকদের কথা বিবেচনা করে কারখানায় দ্রুত গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি এখানে আরও একটি সার কারখানা স্থাপনের দাবী সংশ্লিষ্টদের।


