‘হেলমেট পরা কিছু লোক ও কিছু পুলিশকে গুলি করতে করতে এগিয়ে আসতে দেখে আমি পালানোর চেষ্টা করি। এ সময় পেছন থেকে একটি গুলি এসে আমার ডান পায়ে লাগে। পরে আমার একটি পা কেটে ফেলতে হয়।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মামলায় এমন জবানবন্দি দিয়েছেন ঘটনায় ভুক্তভোগী সাক্ষী মো. ইমরান হোসেন। নিজের জীবনের এমন করুণ পরিণতির জন্য শেখ হাসিনা, আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানকে দায়ী করেন ইমরান।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জবানবন্দি গ্রহণ করে। সাক্ষ্যগ্রহণের পথম দিন রোববার এ মামলায় দুজন সাক্ষী জবানবন্দি দেন। ৩ মার্চ পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণ করা হবে।
এ মামলার প্রথম সাক্ষী, ৩৩ বছরের ইমরান হোসেন আদালতে জবানবন্দি দেন। তিনি বলেন, আমি একটি কোম্পানিতে চাকরি করতাম। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকালে অফিসের কাজে মিরপুর-১১ নম্বরের একটি ব্যাংকে যাই। মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় গন্ডগোল ও গোলাগুলি হচ্ছে জেনে একটু দেরি করে বের হই। একপর্যায়ে দেখতে পাই, অনেক ছাত্র-জনতা মিরপুর-১০ নম্বরের দিকে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর পার হওয়ার জন্য রওনা দিই।
সাক্ষী উল্লেখ করেন, ১০ নম্বর গোলচত্বর পৌঁছাতেই দেখি, হেলমেট পরা কিছু লোক ও কিছু পুলিশ গুলি করতে করতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তখন আমি পালানোর চেষ্টা করি। এ সময় পেছন থেকে একটি গুলি এসে আমার ডান পায়ে লাগে। অজ্ঞান হয়ে আমি ঘণ্টাখানেক সেখানে পড়ে ছিলাম। জ্ঞান ফেরার পর দুজন লোক আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ৩২ দিন পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করি। ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট আমার একটি পা কেটে ফেলা হয়।
দ্বিতীয় সাক্ষী মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার মো. কামাল হাওলাদার। তিনি জবানবন্দিতে জানান, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই দুপুরে তিনি ও তার ছেলে সিফাত মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় কাঁচাবাজার করতে যান। তখন তিনি একটি ছোট টংদোকানে সিগারেট খেতে যান। সিফাত মিরপুর-১০ নম্বরে আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে মিছিলে যোগ দেয়। তিনি হঠাৎ শুনতে পান সিফাত গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
তিনি দৌড়ে সেখানে গিয়ে দেখতে পান, তার ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। তাকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সিফাতকে মৃত ঘোষণা করেন। কামাল হাওলাদার ছেলের মৃত্যুর জন্য শেখ হাসিনা, আনিসুল হক, সালমান এফ রহমানসহ আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের দায়ী করেন।
১২ জানুয়ারি সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হকের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়।
প্রসিকিউশনের দাবি, গণঅভ্যুত্থান দমনে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত সহিংসতার সঙ্গে আসামিরা জড়িত ছিলেন। অভিযোগে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে ষড়যন্ত্র করা হয় এবং ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র কর্মীরা একাধিক স্থানে হামলা চালায়। এর মধ্যে রাজধানীর মিরপুরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, তাতে বিভিন্ন ঘটনায় মোট ৩০ জন নিহতের তথ্য প্রসিকিউশন থেকে দাবি করা হয়েছে।
প্রসিকিউশন আরও জানায়, সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারের দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকলেও সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। আদালতে উপস্থাপিত টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ডে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনার প্রমাণ রয়েছে বলে প্রসিকিউশনের দাবি। একটি কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ‘শেষ করে দিতে হবে’; এমন মন্তব্য হত্যাকাণ্ডে উসকানির ভূমিকা পালন করেছে বলেও প্রসিকিউশনের যুক্তি।
তবে আসামিপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, উপস্থাপিত প্রমাণ আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।


