গাজা যুদ্ধ শেষ হলে ফিলিস্তিনের অন্তর্বর্তী প্রশাসনের দায়িত্ব নিতে পারেন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।
যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার আওতায় ‘গাজায় নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী প্রশাসনের’ নেতৃত্ব দিতে বিশ্বনেতাদের আলোচনায় তার নাম উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্লেয়ার জাতিসংঘ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সহায়তায় গাজায় একটি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব দেবেন। তারা পরবর্তীতে গাজার শাসনভার ও নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিনিদের হাতে ফিরিয়ে দেবেন।
এ বিষয়ে ব্লেয়ারের কার্যালয় জানায়, তার ওপর গাজার নিয়ন্ত্রণের ভার এলে, ফিলিস্তিনের জনগণকে ‘বাস্তুচ্যুত’ করার কোনো প্রস্তাব তিনি কিছুতেই সমর্থন করবেন না।
বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাজ্যকে জড়ান ব্লেয়ার। এবার তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রসহ উচ্চপর্যায়ের বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন। আগস্টে তিনি হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ‘গাজার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন।
মার্কিন প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ গাজায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাবকে ‘অত্যন্ত বিস্তৃত’ পরিকল্পনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্লেয়ার গাজা ইন্টারন্যাশনাল ট্রানজিশনাল অথরিটি (গিটা) নামের একটি সংস্থার প্রধান হবেন। পাঁচ বছরের জন্য গাজার ‘সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও আইনি কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে তারা জাতিসংঘের ম্যান্ডেট চাইবেন।
পূর্ব তিমুর ও কসোভোর স্বাধীনতার পথ সুগম করতে যে ধরনের আন্তর্জাতিক প্রশাসন গঠিত হয়েছিল, এখানেও সেই একই কাঠামোয় ফিলিস্তিন ও গাজার স্বাধীনতার পথ সুগম করার কাজ চলবে।

প্রাথমিকভাবে সংস্থাটির কার্যালয় গাজার দক্ষিণের রাফাহ সীমান্তের কাছের দেশ মিশরে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। সেখান থেকেই তারা গাজায় শাসন, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কাজ শুরু করবেন। পরবর্তীতে গাজা ‘স্থিতিশীল’ হলে ‘বহুজাতিক বাহিনীর’ সঙ্গে সংস্থাটি সরাসরি গাজায় প্রবেশ করবে।
টনি ব্লেয়ার ২০০৭ সালে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের কোয়ার্টেটের (যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও জাতিসংঘ, এ চারটিকে একত্রে কোয়ার্টেট বলা হয়) দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন থেকেই তিনি ফিলিস্তিনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পরিবেশ তৈরির দিকে জোর দেন।
এদিকে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস গত বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, তিনি দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক ‘শান্তি পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ অন্য বিশ্বনেতার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত আছেন। মাহমুদ আব্বাস জোর দিয়ে বলেন, ‘ভবিষ্যতে গাজার শাসনব্যবস্থায় “হামাস” কোনো ভূমিকা রাখবে না। তাদের নিরস্ত্র হতে হবে।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে জাতিসংঘের ৮০তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ অন্তত ছয়টি দেশ। প্রেসিডেন্ট আব্বাস তাদের ধন্যবাদ দিয়ে ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে থাকায় কৃতজ্ঞতা জানান।
এর আগে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধিক প্রস্তাব দেন বিশ্বনেতারা। গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প বলেন, ‘গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্র শহরটির ওপর “দীর্ঘমেয়াদি মালিকানা” নেবে।’ গাজাকে তিনি ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা (কেন্দ্র)’ করার স্বপ্ন দেখালেও বাস্তবে তা ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি করার পরিকল্পনা, যা আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাবি করেছিল, এটি হবে উন্নত জীবনের আশায় গাজাবাসীর ‘স্বেচ্ছা অভিবাসন’।

এরপর মার্চে ২১ লাখ গাজাবাসীকে না সরিয়ে গাজা পুনর্গঠনে সম্মিলিত প্রস্তাব দেয় আরব দেশগুলো। ওই প্রস্তাবে স্বাধীন প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে গাজায় ফের শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস আরব দেশগুলোর ওই প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও তা প্রত্যাখ্যান করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
এদিকে জাতিসংঘে যখন ফিলিস্তিনিদের পক্ষে তীব্র জনমত গঠিত হচ্ছে, তখনও গাজায় ভয়াবহ হামলা ও অভিযান অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। বিশ্বনেতাদের দাবি ও নিন্দার মুখেও গাজায় ‘হামাসবিরোধী অভিযান’ চলবে বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। গাজায় সবশেষ শুক্রবার ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৬০ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।


