গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ৮১ ফুট উঁচু একটি ‘রামমূর্তি’ নির্মাণের ঘটনাকে সরকার এখন কেবল ধর্মীয় বিষয় হিসেবে দেখছে না, বরং এর পেছনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে। পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
প্রশাসনের আশঙ্কা, রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা অথবা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা হতে পারে।
এ কারণে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে এবং কেউ যেন এই ইস্যুটিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
এদিকে, ‘শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালীমন্দির’ এর প্রতিষ্ঠাতা হরিদাস চন্দ্র তরনীদাসেরর নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের তথ্য বেরিয়ে আসছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করা তরনীদাস অতীতে প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে আরও অনেক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ রয়েছে।
রামমূর্তি নির্মাণকে কেন্দ্র করে একদিকে মুসলিম ধর্মীয় সংগঠনগুলোর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে হিন্দু সংগঠনগুলো বিক্ষোভ করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক অনুবিভাগ) জিয়াউদ্দিন আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় গাইবান্ধার ডিসি ও এসপিকে বিশেষ নজরদারি করতে বলা হয়েছে। কেউ বিশৃঙ্খলা করার চেষ্টা করলে পুলিশ ছাড়াও বিজিবি প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ধর্মীয় বিষয়কে সামনে এনে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী যেন ফায়দা নিতে না পারে, সেজন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
গাইবান্ধার পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন টাইমস’কে বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যেন নষ্ট না হয়, সে ব্যাপারে প্রশাসন সম্পূর্ণ সতর্ক। এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে কেউ যেন নিজের স্বার্থ উদ্ধার করতে না পারে, তা নিয়ে কাজ চলছে। বর্তমান পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং মন্দির কর্তৃপক্ষ আপাতত মূর্তি নির্মাণ ও উদ্বোধনের কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল মন্দির নির্মাণ
পলাশবাড়ীর মধ্যরামচন্দ্রপুর এলাকার স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা কনক চন্দ্র জানান, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই এই খোলা জায়গাটিতে কালীপূজা ও শিবপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব হতো। ১৯৮৭ সালে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের দুটি পক্ষ সেখানে একটি ছোট আধা-পাকা ঘর তৈরি করে পূজা চালু রাখে। পরবর্তীতে জমির মালিকানা ও মন্দির পরিচালনা নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। আদালত জায়গাটিকে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ‘মধ্যরামচন্দ্রপুর শিব ও কালীমন্দির’ এর পক্ষে রায় দেন।
এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মন্দিরটি আধুনিক করার উদ্যোগ নেন হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস। তিনি স্থানীয় দুটি পক্ষকে নিয়ে সমঝোতা বৈঠক করেন এবং নিজে সভাপতি ও বিপিন চন্দ্রকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি কমিটি গঠন করেন। ২০২৫ সালের ১ মে পুরোনো ঘর ও গাছপালা সরিয়ে নতুন করে নির্মাণকাজ শুরু হয়। এ সময় মন্দিরের নাম বদলে রাখা হয় ‘শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালীমন্দির’ এবং গ্রামের নাম মধ্যরামচন্দ্রপুর থেকে পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বৃন্দাবনপাড়া’।
প্রথমে মন্দির প্রাঙ্গণে একটি ৫১ ফুট উঁচু কৃষ্ণমূর্তি বসানো হয়। এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৮১ ফুট উঁচু রামমূর্তি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা হরিদাসের দাবি, এই প্রকল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল এবং এতে খরচ ধরা হয়েছিল প্রায় ৪১ কোটি টাকা। তবে অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত এর নির্মাণকাজ ও উদ্বোধন স্থগিত করা হয়।
যেভাবে স্থগিত হলো ‘রামমূর্তি’ প্রকল্প
স্থানীয় প্রশাসনের উদ্বেগ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বিবেচনা করে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কমিটি এই রামমূর্তি নির্মাণকাজ আপাতত স্থগিত ঘোষণা করেছে। গত ১১ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে মন্দির কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, রামমূর্তি নির্মাণ নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ও আপত্তি উঠেছে। তাই এলাকার শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে মন্দিরের নিয়মিত ধর্মীয় ও সামাজিক কাজ আগের মতোই চালু থাকবে।
এর আগে, গত ৫ জুন পলাশবাড়ীতে নির্মাণাধীন এই মূর্তিকে ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ রামমূর্তি’ উল্লেখ করে তা অপসারণের দাবি জানায় ইমাম-উলামা পরিষদ। সংগঠনটির জেলা সভাপতি মুফতি মাহমুদুল হাসান কাসেমী সংবাদ সম্মেলন করে বিক্ষোভসহ বিভিন্ন কর্মসূচির ঘোষণা দেন। উলামা পরিষদের নেতারা এই প্রকল্পের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করে এর অর্থের উৎস, ব্যয়ের পরিমাণ এবং এর পেছনে দেশি-বিদেশি কোনো মহলের যোগসূত্র বা জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি আছে কি না, তা তদন্ত করার দাবি জানান। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তাদের কর্মসূচি চলার পর মন্দির কর্তৃপক্ষ কাজ স্থগিতের ঘোষণা দেয়।
অন্য দিকে, রামমূর্তি নির্মাণের পক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকটি সংগঠন দেশজুড়ে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ করেছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ডাকে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়।
হরিদাসের যত বিতর্কিত কর্মকাণ্ড
মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা হরিদাসকে নিয়ে এলাকায় নানা বিতর্ক রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তার নামে একাধিক প্রতারণার মামলার কথা জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র ও নথিপত্র থেকে জানা যায়, পলাশবাড়ীর মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে হরিদাসের জন্ম। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর তিনি ছোটখাটো কাজ করতেন। ২০০০ সালের দিকে তিনি ভারতে যান এবং সেখানে প্রায় নয় বছর থাকেন। ২০১০ সালে দেশে ফিরে ঢাকার উত্তরায় এসি মেকানিক ও ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ শুরু করেন। ২০১৪ সালের পর হঠাৎ করেই তার আর্থিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি হতে থাকে, যা নিয়ে এলাকায় গুঞ্জন শুরু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তিনি বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতেন। ২০১৯ সালে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় একটি রিসোর্ট প্রকল্প শুরু করে অনেকের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চাকরি দেওয়া, বদলি করা, সরকারি টেন্ডার বা কাজ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে তিনি অনেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন।
প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২২ সালের নভেম্বরে ঢাকার বনানী থেকে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন হরিদাস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি আবারও পলাশবাড়ীতে সক্রিয় হন এবং রামমূর্তি, দোকানপাট, আবাসিক ভবনসহ বিশাল এক প্রকল্প শুরু করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই মন্দিরের দোকান বরাদ্দ, সদস্যপদ এবং অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার কথা বলে তিনি মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের জামানত নিয়েছেন।
জানা গেছে, মন্দির এলাকায় দুই বছরের জন্য কফি শপ দেওয়ার কথা বলেপলাশবাড়ীর ইটভাটা ব্যবসায়ী স্বর্গীয় গোপাল চন্দ্রের ছেলে গোপন চন্দ্রের কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা নেন হরিদাস। পরে একই জায়গায় আরেকটি কফি শপ বসানো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও থানার পুলিশের মধ্যস্থতায় টাকা ফেরত দেওয়ার শর্তে বিষয়টি মীমাংসা হয়। এ ছাড়া, সেখানে একটি বৃদ্ধাশ্রম করা হচ্ছে জানিয়ে সদস্যপদের নামে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০০১ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার মানুষ এর সদস্য হয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মাইকে প্রচার করা হচ্ছে যে ভক্তদের দানে এখানে আশ্রয়ন ও বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে ১১০ টাকা ও ৫০ টাকার টোকেন কিনে ভক্তদের নিরামিষ খাবার খেতে হচ্ছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস জানান, এসব অভিযোগ নিয়ে তার কোনো বক্তব্য নেই। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি এখন আর শুধু বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে গেছে। দেশের হিন্দুরা তার পক্ষে প্রতিবাদ করছে এবং ভারতেও এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তিনি বলেন, হরিদাসকে এখন পুরো পৃথিবী চেনে।
গাইবান্ধার পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন বলেন, মন্দিরটির উদ্যোক্তা হরিদাসের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালেও তিনি একটি প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং এখনো তার নামে মামলা চলছে। হঠাৎ করে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ সুপারের মতে, মন্দির নির্মাণের আড়ালে হরিদাসের একটি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য রয়েছে।


