দেশে গত মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিক নির্যাতন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপসহ নানা ঘটনায় মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
শুক্রবার প্রকাশিত সংগঠনটির মে মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতার ৬৪টি ঘটনায় অন্তত ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ৬৬টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন এবং আহত হয়েছেন আরও ৬৮ জন।
সংগঠনটি জানিয়েছে, দেশের ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ এবং তাদের নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতার বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে আধিপত্য বিস্তার, দলীয় কোন্দল, রাজনৈতিক বিরোধ ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে। ৬৪টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১৮টি ঘটনায় ১১৪ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ১০টি ঘটনায় ৪৯ জন আহত ও একজন নিহত এবং বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ১৪টি ঘটনায় ৭২ জন আহত ও দুইজন নিহত হয়েছেন।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনাও বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। মে মাসে অন্তত ৩৯টি ঘটনায় ৭৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪২ জন আহত, ১৮ জন লাঞ্ছিত এবং ৯ জন হুমকির মুখে পড়েন। একজন সাংবাদিককে আটক এবং দুটি মামলায় আটজন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।
নারী ও শিশুর মানবাধিকার পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ৩০৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৩ জন ধর্ষণের শিকার, যার ৫৭ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। ১৭ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর ছয়জনকে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে পারিবারিক সহিংসতায় ৬৩ জন নারী নিহত এবং ৪৫ জন আত্মহত্যা করেছেন।
অন্যদিকে, অন্তত ২১৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত তিন মাসে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা ও টিকা ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে সারা দেশে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পাওয়ার দাবি করে এইচআরএসএস জানায়, মে মাসে অন্তত ১১টি ঘটনায় ছয়জনকে আটক করা হয়েছে এবং সাতটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ এবং রাজনৈতিক সমালোচনাকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, অন্তত ১০টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ৪১ জন আহত হয়েছেন।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। তাদের তথ্যমতে, মে মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ছয়টি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হামলায় চারজন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ১৪ জনকে আটক এবং ১৬৬ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করা হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিনজন নিহত ও একজন আহত হন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার তিনটি ঘটনায় পাঁচজন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ছয়টি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর এবং একটি ভূমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মাজারে হামলার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
শ্রমিকদের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। মে মাসে শ্রমিক নির্যাতনের ৫৭টি ঘটনায় ২০ জন নিহত ও ১৩০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে ৪১ জন শ্রমিক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।
কারাগারে মে মাসে অন্তত সাতজন বন্দির মৃত্যুর তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। পাশাপাশি বিভিন্ন সহিংস ও রাজনৈতিক ঘটনায় ২৩টি মামলা এবং ২১২টি ঘটনায় অন্তত ২৪২ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের উপসংহারে এইচআরএসএস বলেছে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সংগঠনটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।


