বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন (ইইউ ইওএম) ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে আরও সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে ছয়টি অগ্রাধিকারমূলক সুপারিশ দিয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক মানদণ্ড সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব সুপারিশ করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে মিশনটি। দুই মাসব্যাপী দেশজুড়ে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধান পর্যবেক্ষক এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভার্স ইজাবস নির্বাচনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এই বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত নির্বাচন গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এতে সব অংশীজনের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি যৌথ অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন জনআস্থা বাড়ালেও আইনি ও প্রক্রিয়াগত কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে, যা জুলাই জাতীয় সনদসহ ভবিষ্যৎ সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেয়।’
ছয়টি সুপারিশ
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ইইউ ইওএম ছয়টি প্রধান সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচন-সংক্রান্ত আইন কাঠামোর ব্যাপক সংস্কার, নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য শক্তিশালী বিধি ও তদারকি ব্যবস্থা চালু করা এবং রাজনীতি ও জনজীবনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া।
এ ছাড়া নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিস্তৃত সংস্কার, ভোট গণনার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ আরও বেশি শ্রেণির ভোটারের জন্য সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মোট ১৯টি সুপারিশ রয়েছে প্রতিবেদনে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা জোরদার করার লক্ষ্যে দেওয়া হয়েছে। পুরো প্রতিবেদনটি ইইউ ইওএমের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
ইতিবাচক অগ্রগতি
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিস্থাপকতার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, হালনাগাদ আইনি কাঠামো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার প্রবাসী ভোটারকে ভোটাধিকার দেওয়ার উদ্যোগের প্রশংসা করা হয়েছে।
নির্বাচনী অনুসন্ধান ও নিষ্পত্তি কমিটিগুলোর কার্যক্রমও প্রশংসিত হয়েছে, যারা প্রচারসংক্রান্ত নিয়ম কার্যকরে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। প্রতিবেদনে নাগরিক পরিসরের পুনরুজ্জীবন এবং ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় জাতীয় উদ্যোগগুলোকেও ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়ে গেছে নানা চ্যালেঞ্জ
তবে অগ্রগতির পাশাপাশি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে, যেগুলো দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্বে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব নির্দেশ করে।
এ ছাড়া প্রচার-সংক্রান্ত বিধি প্রয়োগে অসামঞ্জস্য এবং নির্বাচনী ব্যয়ের তদারকির সীমাবদ্ধতার কারণে সমতল প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অনলাইন হয়রানি ও ডিজিটাল সহিংসতার ঘটনা, সঙ্গে পর্যাপ্ত পুলিশি সুরক্ষার অভাব—এসব কারণে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোও ডিজিটাল তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইভার্স ইজাবস বলেন, ‘এখন প্রয়োজন এমন সংস্কারে মনোযোগ দেওয়া, যা স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন জোরদার করবে, নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন করবে এবং অনলাইন ও অফলাইন—দুই ক্ষেত্রেই বহুমাত্রিক ও নিরাপদ মতবিনিময়ের পরিবেশ তৈরি করবে।’
তিনি আরও বলেন, সদ্য স্বাক্ষরিত পার্টনারশিপ অ্যান্ড কো-অপারেশন চুক্তির আলোকে এসব প্রচেষ্টায় বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রস্তুত রয়েছে।
২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে কাজ করেছে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের মোট ২২৩ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক অংশ নেন। দেশের ৬৪টি জেলাতেয় তাদের অবস্থান ছিল।


