আগামীকাল সেই দিন। বছরের পর বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, অনিশ্চয়তা আর রাজনৈতিক ভাঙাগড়ার পর দেশ এমন একটি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের পর প্রথম সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সংসদীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে বলে প্রত্যাশা করছেন অনেকে।
বিতর্কিত নির্বাচন আর গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণে ক্ষতবিক্ষত একটি দেশের জন্য এই ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচনকে দেখা হচ্ছে চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে।
বিশাল ত্যাগের বিনিময়ে এসেছে এই মুহূর্তটি। ব্যালট বাক্স পর্যন্ত পৌঁছানোর এই পথটি তৈরি হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। যার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসা শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটেছে।
বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর টানা আন্দোলনের পরেও এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যে সরকার ছিল প্রায় অটল, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে।
গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের শাসনামলে এই দুই দলই চরম দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে; তাদের অসংখ্য নেতাকর্মী নিহত, আহত, কারাবন্দী কিংবা গুম হয়েছেন। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ১ হাজার ৪০ ‘র বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং অগণিত মানুষ আহত হয়েছেন।
শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিভিন্ন মহল থেকে মাঝেমধ্যে সমালোচনা ও হতাশা এলেও, এই প্রশাসন শেষ পর্যন্ত দেশটিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
তবে এই যাত্রা ছিল সন্দেহ আর অবিশ্বাসে ঘেরা। গত মঙ্গলবার প্রচার শেষ হওয়ার সময়ও ভোট আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় ছিল। এই যে দেশ এখন ভোটের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে বড় কৃতিত্ব নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল এবং সেই জনগণের; যারা এই সুযোগটিকে হাতছাড়া হতে দিতে চায়নি।
অবশ্য এই নির্বাচন পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক নয়। দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল কিন্তু কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এই প্রক্রিয়ার বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে রয়ে গেছে। অনেকে মনে করেন সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের পর দলটির নির্বাচনে আসার নৈতিক ভিত্তি নেই, তবে তাদের বাইরে রেখে এই প্রক্রিয়াটি সত্যিকার অর্থে পূর্ণ হয় না।
দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি জোরালো মত হলো–বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকাল ধরে কোনো অনির্বাচিত প্রশাসন দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না। সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা, আওয়ামী লীগ তার অতীতের ভুল ও অপরাধ স্বীকার করবে এবং অপরাধী নেতাদের সরিয়ে দিয়ে ভবিষ্যতে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসবে।
এত সীমাবদ্ধতার পরেও এবারের নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। কে পরবর্তী সরকার গঠন করবে বিষয়টি কেবল তা নিয়ে নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা, সামাজিক সংহতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের টিকে থাকার লড়াই।
গত তিনটি নির্বাচন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে কঠোর সমালোচিত হয়েছিল, কারণ সেগুলো জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছিল। এবার প্রত্যাশা একেবারেই ভিন্ন।
নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের কাছে ভোট দেওয়া এখন আর কোনো সাধারণ আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি দেশের ভবিষ্যতের মালিকানা পুনরুদ্ধার এবং ভয়-ভীতি ও বর্জনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে উত্তরণের একটি অনন্য সুযোগ।
এই প্রেক্ষাপটে ‘ব্যালট’ এখন একটি প্রতীকী গুরুত্ব পেয়েছে। দেশে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন সম্ভব কি না, এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে তার একটি সম্মিলিত পরীক্ষা।
অবশ্য দেশজুড়ে গুমোট ভাব এখনো কাটেনি। গুজব, উসকানি আর নাশকতার আশঙ্কার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগও রয়েছে। আর সেসব এখনো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
এসব উদ্বেগ মনে করিয়ে দেয় যে, বছরের পর বছর প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের ফলে অবিশ্বাস কতটা গভীরে প্রোথিত হয়েছে। তাই ভোটের এই শেষ মুহূর্তে উৎসাহের পাশাপাশি সংযম ও নাগরিক দায়িত্বশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণের অন্যতম বিষাক্ত ফল হলো দৈনন্দিন সম্পর্কের ভাঙন। পরিবার, বন্ধুত্ব ও পাড়া-প্রতিবেশী রাজনৈতিক পরিচয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই ভোট সেই ক্ষত সারিয়ে তোলার একটি সুযোগ হতে পারে।
গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা মানেই সামাজিক শত্রুতা নয়। মতভেদ মানেই অন্যকে হেয় করা নয়। শ্রদ্ধাপূর্ণ বিতর্কের সংস্কৃতি ছাড়া গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে।
সংঘাতময় রাজনীতির প্রতি মানুষের ক্লান্তি এখন স্পষ্ট। ভোটাররা এখন ‘ট্যাগিং ও গালাগালি’ এবং ত্যাগের রাজনীতির বাণিজ্যিকীকরণের অবসান চান। স্লোগানের বদলে তারা এখন সমস্যার সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া পরিচ্ছন্ন রাজনীতি চান। দলগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দোষারোপের রাজনীতি ছেড়ে জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা উপস্থাপন করা।
এই মুহূর্তের মূল প্রশ্নটি হলো; দেশের রাজনীতির ধরন কি শেষ পর্যন্ত বদলাবে?
অনেকের জন্য এই উত্তরটিই ঠিক করে দেবে নির্বাচনটি একটি নতুন মোড় হবে নাকি কেবল আরেকটি ঘটনাক্রম। ব্যক্তিগত আক্রমণ, ‘সবকিছু বিজয়ী দলের’; এমন মানসিকতা এবং সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে রাজনীতিকে ব্যবহার করা জনআস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এখন সময় এসেছে নীতি-নির্ধারণী বিতর্ক, প্রতিপক্ষের স্বীকৃতি এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যের রাজনীতির। এটি না হলে দেশ নির্বাচনের কাঠামো পেলেও প্রকৃত গণতন্ত্র থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে।
এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা হবে নির্ধারক। একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারত্বের ওপর নির্ভর করছে। ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্য এই ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত, তাই ছোট কোনো বিচ্যুতিও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে।
সবশেষে, ভোট কেবল একটি অধিকার নয়, বরং একটি নৈতিক দায়িত্ব। সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক প্রতিনিধিদের সমর্থন দেওয়ার আহ্বান আসলে জনজীবনে নৈতিক পরিবর্তনের একটি আকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিফলিত করে।
নির্বাচনের ফলাফলের পর যা ঘটবে, তা ভোটের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। জয়-পরাজয় উভয় পক্ষকে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিপক্কতার পরিচয় দিতে হবে। একটি বিভক্ত সমাজকে শাসন করার জন্য আপস ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতা প্রয়োজন। নেতৃত্ব পথ দেখাতে পারে, কিন্তু একটি সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ জাতিই দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ভোটারদের সামনে পছন্দটি কেবল কোনো দল বা ব্যক্তির মধ্যে নয়; এটি বিভক্তির বৃত্তে আটকে থাকা অথবা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়বিচারপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করার মধ্যবর্তী একটি পছন্দ। এই নির্বাচন প্রকৃত অর্থেই একটি নতুন মোড় কি না, তা কেবল ভোটের ওপর নয়, বরং আগামী দিনগুলোতে আমাদের আচরণ, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা এবং বজায় রাখা ঐক্যের ওপর নির্ভর করবে।


