চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ। চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় এটি নবায়নের জন্য আলোচনা শুরু করার জরুরি প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, এই চুক্তি ৩০ বছর মেয়াদে কার্যকর থাকবে। উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এটি নবায়ন করা যাবে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে এক বছরেরও কম সময় বাকি থাকায়, এটি নবায়নের জন্য কূটনৈতিক ও কারিগরি প্রস্তুতি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনা এখনই শুরু করা উচিত। কারণ হাতে সময় কম এবং একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় কারিগরি প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক ঐকমত্য—উভয়ই প্রয়োজন। তারা জোর দিয়ে বলছেন, আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আগে দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে ব্যাপক রাজনৈতিক বোঝাপড়া থাকা জরুরি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. আব্দুল হাই টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, চুক্তিটি সফলভাবে নবায়নের জন্য রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। তিনি বলেন, `চুক্তি নবায়ন করতে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকতেই হবে। এই চুক্তি বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। যত দ্রুত আলোচনা শুরু হবে, ততই ভালো।’
নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের সাবেক উপ-হাইকমিশনার ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুব হাসান সালেহ একই মত পোষণ করে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেকোনো চুক্তিতে পৌঁছতে হলে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিষয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে একটি রাজনৈতিক বোঝাপড়া থাকতে হবে।’
তার মতে, আলোচনাকে এগিয়ে নিতে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। এই নির্দেশনা যৌথ পরামর্শক কমিশনে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অথবা যৌথ নদী কমিশনের পানিসম্পদ মন্ত্রীদের আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোর যেকোনোটি আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করার কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
এখনো গঠিত হয়নি যৌথ কারিগরি কমিটি:
২০২৪ সালের জুনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরকালে, উভয় পক্ষ গঙ্গা চুক্তির নবায়ন নিয়ে আলোচনা শুরুর জন্য একটি ‘যৌথ কারিগরি কমিটি’ গঠনের বিষয়ে একমত হয়েছিল। সফরের পর জারি করা যৌথ ইশতেহারে এই অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখা যায়।
ইশতেহারে ১৯৯৬ সালের চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরু করার জন্য কমিটি গঠনকে স্বাগত জানানো হয়। এছাড়া পারস্পরিকভাবে সম্মত সময়সীমার মধ্যে ভারতের সহায়তায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তিস্তা নদী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও সেই যৌথ কারিগরি কমিটি এখনো গঠিত হয়নি।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি কতটা জরুরি সরকার তা জনে। তিনি বলেন, “আমরা জানি যে সময় সীমিত। নতুন সরকার সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং আমরা এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেব।”
যৌথ নদী কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কারিগরি প্রস্তুতি অনেকটাই সম্পন্ন এবং তারা আলোচনার জন্য প্রস্তুত। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আমাদের কারিগরি হোমওয়ার্ক শেষ করেছি এবং আলোচনার জন্য প্রস্তুত আছি।’
তার দেওয়া তথ্যমতে, গঙ্গার পানি প্রবাহের ঐতিহাসিক তথ্য এবং ঋতুভিত্তিক পরিবর্তনের বিস্তারিত বিশ্লেষণসহ ব্যাপক কারিগরি তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গত বছর দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের তিনটি নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে চুক্তি নবায়নের বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচিত হয়েছে।
দরকার দৃঢ় রাজনৈতিক বোঝাপড়া:
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, পানি বণ্টন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক ইস্যু এবং যেকোনো আন্তঃসীমান্ত নদী চুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সুদৃঢ় রাজনৈতিক বোঝাপড়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রদূত সালেহ উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের জনমত এই আলোচনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, ‘চুক্তিটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে তা ভারত-বিরোধী মনোভাব কমাতে সাহায্য করবে এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার জন্য আরও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করবে।’
সালেহ আরও যোগ করেন, যদি উভয় পক্ষ একমত হয়, তবে আগামী ৩০ বছরের জন্য গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন করা খুব একটা সমস্যা হবে না। যদিও এতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সম্মতির প্রয়োজন হবে, যা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান চুক্তিতে উল্লিখিত পানির পরিমাণের চেয়ে শুষ্ক মৌসুমে উভয় পক্ষই বেশি পানির প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। তাই নতুন গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির আলোচনা সহজ হবে না।”
সালেহ আন্তঃসীমান্ত নদী সংক্রান্ত পানি বণ্টন ইস্যুতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বের ওপরও জোর দেন, কারণ তাদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৯৬ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের প্রেক্ষাপট স্মরণ করে তিনি বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার গুরুত্বের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘যখন চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়, তখন আমি একজন তরুণ কর্মকর্তা ছিলাম। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার মাত্র এক মাস আগে নভেম্বরে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ঢাকা সফর করেছিলেন। সেটি ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ সফর এবং তিনি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য তার সম্মতি দিয়েছিলেন।’


