সমাজের বিশিষ্টজনরা বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ছিলেন একজন জাতীয় নেত্রী, যিনি দল-মত নির্বিশেষে দেশের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় কারাবন্দী ও গৃহবন্দি থাকার পরেও প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহারের বার্তা দিয়েছেন, ‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়’।
ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে তার শেষ বার্তা ছিল জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। গত ১০০ বছরে উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্রের জন্য খালেদা জিয়ার মতো কেউ সংগ্রাম করেননি বলেও শোক সভায় উল্লেখ করা হয়।
শুক্রবার বিকালে ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় বিশিষ্টজনেরা এসব কথা বলেন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, ব্যক্তিত্ব, গণতান্ত্রিক আদর্শ এবং জীবিতাবস্তায় তার চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় তদন্তের আওতায় নিয়ে আসার বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
এদিন দুপুর আড়াইটার পর কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে পূর্বনির্ধারিত সময়ে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। শোকসভায় শোকবার্তা পাঠ করা হয়।

শোকসভায় যোগ দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা।
যোগ দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। পাশাপাশি অনুষ্ঠানে আসেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরা। অনুষ্ঠানে আসার জন্য আগে থেকেই আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয় অতিথিদের জন্য। সেখানে আমন্ত্রণপত্র ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, সাংবাদিক, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সম্পাদক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যোগ দেন।
খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত এ নাগরিক শোকসভায় যায় যায় দিন সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, ‘শোককে শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘এই শোকসভা অর্থবহ হবে তখনই, যখন মানুষ ভোট দিয়ে তার শ্রদ্ধা প্রকাশ করবে।’ তিনি আসন্ন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করার আহ্বান জানান।
ইংরেজী দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি খালেদা জিয়ার সহনশীলতা ও সমালোচনা নেওয়ার ক্ষমতা তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।’
তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় কারাবন্দী ও গৃহবন্দি থাকার পরও তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহারের বার্তা দিয়েছেন “ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়”।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে তার শেষ বার্তা ছিল জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের ভবিষ্যত জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সফলতার ওপর নির্ভর করবে, তাই আমরা যেন ওনার এই কথা মনে রাখি।’
নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবির বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া ছিলেন এমন একজন নেত্রী, যিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কঠোর আঘাত ও নিপীড়নের মুখেও প্রকাশ্যে কখনো বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দেননি।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যখন শালীনতা ও পরিমিতিবোধের খরা চলছে, তখন দেখেছি তিনি ব্যক্তিগত আঘাতের পরও সংযম বজায় রেখেছেন।’
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের একটি ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একজন গৃহবধূ হয়েও তিনি অবাঙালিদেরকে তাদের আবাসিক এলাকায় অবস্থিত একটি অস্ত্রাগার খোলার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে বড় ধরনের রক্তপাত ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছিলেন।’
এ ঘটনাকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনাপর্বে তার ‘অপ্রত্যক্ষ কিন্তু অনন্য অবদান’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘একই সংসার থেকে স্বামী-স্ত্রী পুরো রাজনৈতিক জীবনজুড়ে জাতির সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন–এমন উদাহরণ বিশ্ব ইতিহাসে নেই।’
তিনি জিয়াউর রহমানের সততা ও সাহসিকতার কথা তুলে ধরেন এবং বলেন, ‘খালেদা জিয়া ক্ষমতায় না থেকেও মানুষের হৃদয়ে ছিলেন, আর সে কারণে তার জানাজায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত কান্না দেখা গেছে।’
তিনি বলেন, ‘এই উপমহাদেশের ১০০ বছরের ইতিহাসে গণতন্ত্রের জন্য বেগমজিয়ার মতো সংগ্রাম করেছেন–এমন দ্বিতীয় কেউ নেই।’
তারেক রহমানের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘এই উত্তরাধিকার বহন করা গর্বের, আবার কঠিন দায়িত্ব।’
খালেদা জিয়ার চীফ ফিজিশিয়ান ডা. এফ এম সিদ্দিকী তার চিকিৎসা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘অনেকে প্রশ্ন করেন, ম্যাডামকে কি স্লো পয়জনিং করা হয়েছিল কি না। বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি বলতে চাই, মেথোট্রেক্সেট নামের একটি ওষুধ তার ফ্যাটি লিভার ডিজিজকে দ্রুত সিরোসিসে পরিণত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ওষুধটি একটি “স্লো পয়জন”-এর মতো কাজ করেছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘চিকিৎসায় অবহেলার কারণে তার লিভার ফাংশনের দ্রুত অবনতি ঘটে এবং একে তিনি “ইচ্ছাকৃত অবহেলা” হিসেবে উল্লেখ করেন।’
ডা. সিদ্দিকী বলেন, ‘এটি খালেদা জিয়াকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।’
এ ছাড়া, তিনি ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় অবহেলার কথাও উল্লেখ করে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়ে সরকারি মেডিকেল বোর্ডের সদস্যদের যোগ্যতা, তাদের খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দায়ভার ও ব্যক্তিগত চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হয়েছিল কি না–এই বিষয়গুলো তদন্তের দাবি করেন এবং সংশ্লিষ্ট সব চিকিৎসা নথি জব্দ করার আহ্বান জানান।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায় উত্থান, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম।’
তিনি বলেন, ‘তিনি অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এটি একটি অক্ষুণ্ন রেকর্ড।’ এক শব্দে তার চরিত্র ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘এক কথায় বলতে গেলে তার মধ্যে এলিগেন্স ছিল, এই মার্জিত বৈশিষ্ট্য আমাদের রাজনীতিতে বিরল।’
তিনি আরও বলেন, ’২০২৪-এর ৭ আগস্ট তিনি যে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন মুক্ত হওয়ার পরে সেখানে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আমাদের প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং এই কথাটা যদি আমরা মনে রাখি, সবার আগে যে জিনিসটা শুরু করতে হবে সেটা হচ্ছে একটা পলিটিক্স রিকনসিলিয়েশন।’
অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘নীতি নির্ধারণে খালেদা জিয়া ছিলেন মনোযোগী শ্রোতা ও বাস্তববাদী সিদ্ধান্তগ্রহণকারী। তিনি কারিগরি পরামর্শ শুনতেন, জাতীয় বাস্তবতা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সর্বশেষ বিএনপির শাসনামলে গ্যাস রপ্তানি না করার বিষয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নেওয়া সিদ্ধান্ত ছিল একটি “নীতি-নির্ধারণী মাইলফলক”। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী তখন বক্তব্য দিয়ে বলেছিলেন, পরবর্তী ৫০ বছরের গ্যাস রেখে বাকি গ্যাস বাংলাদেশ বিক্রি করতে পারে। অথচ বাংলাদেশের একসঙ্গে ৫০ বছর চলার মতো গ্যাসই তখন ছিল না। আমার এ কথাটা খালেদা জিয়া খুব গুরুত্বসহকারে নিয়েছিলেন।’
শোকসভায় বক্তারা একমত হন যে, খালেদা জিয়ার জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
শোক সভায় আরও বক্তব্য দেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, লেখক ফাহাম আব্দুস সালাম, পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী দেবাশীষ রায়, আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ডিপিআইয়ের সভাপতি আব্দুস সাত্তার দুলাল, সাবেক কূটনীতিক আনোয়ার হাশিম, আইসিসি বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য ও ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ, লেখক ও গবেষক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
অনুষ্ঠানে শোকবার্তা পাঠ করেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে স্মরণসভা শেষ হয়।
শোকসভায় বিএনপি নেতাদের মধ্যে যোগ দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, সালাহউদ্দিন আহমদ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা।
এদিকে খালেদা জিয়ার স্মরণে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নাগরিক শোকসভা ঘিরে নিরাপত্তায় ছিলেন সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড, আনসারসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
একই সঙ্গে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। শোকসভাস্থলে মানুষের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। অনুষ্ঠানের শৃঙ্খলার দায়িত্বে ছিলেন বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর সকালে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে মারা যান খালেদা জিয়া। ৩১ ডিসেম্বর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় লাখো মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তার জানাজা শেষ হয়। জানাজা শেষে জিয়া উদ্যানে তার স্বামী জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হয়।


