সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া চলে গেছেন না ফেরার দেশে মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর)। ১৯৯১ সালে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর আরও দুই মেয়াদে তিনি দেশ চালান।
চলচ্চিত্র সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান বলেন, এরশাদ সরকারের আমলে বলতে গেলে রাজনৈতিক ছবি নির্মিত হয়নি। তখন দেশে ফোক ছবির বিকাশ ঘটেছে। বেগম জিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করেই সংস্কৃতি অঙ্গনের বিকাশে বেশ উদার নীতি গ্রহণ করেন। বিশেষ করে চলচ্চিত্রাঙ্গনে তার এ নীতির কারণে প্রচুর রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। এসকল চলচ্চিত্রে যেভাবে দেশের মন্ত্রী, এমপিদের দুর্নীতি দেখানো হয়েছিল, তা সত্যিই বিস্ময়কর।’
১৯৯১ সালে চাষি নজরুল ইসলাম নির্মিত ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’-তে চরাঞ্চলের মানুষের জীবন, চর দখল এবং প্রভাবশালী মহলের নোংরা রাজনীতি দেখানো হয়। একই বছরের কাজী হায়াতের ‘দাঙ্গা’য় সরকার, মন্ত্রী ও এমপিদের নগ্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। ‘হে মাতৃভূমি’ শীর্ষক টাইটেল সংগীতেই পরিচালক তার রাজনৈতিক বক্তব্য স্পষ্ট করেন।
১৯৯২ সালে কাজী হায়াত নির্মিত ‘ত্রাস’-এ ছাত্ররাজনীতির নামে ক্ষমতাসীনদের অস্ত্রায়ন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিপর্যয় দেখানো হয়। যা আজও ছাত্ররাজনীতি বিষয়ক বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত। ১৯৯৩ সালে আসে ‘চাঁদাবাজ’। চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র। “মুক্তিযোদ্ধা কোথায় তুমি” গানটির মাধ্যমে রূঢ় বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়।
১৯৯৪ সালে কাজী হায়াত নির্মাণ করেন ‘দেশপ্রেমিক’। বাকস্বাধীনতায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে নির্মিত এক হৃদয়বিদারক চলচ্চিত্র। বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি মিল না থাকলেও সমসাময়িক দমননীতির প্রতিচ্ছবি এতে স্পষ্ট ছিল।
চলচ্চিত্রকর্মী ফজলে এলাহী বলেন, ‘ছবিগুলোর বিরুদ্ধে তখন সরকার ও বিভিন্ন তরফ থেকে নানারকম সমালোচনা থাকলেও সেগুলো বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় এবং তা বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই হাতে তুলে দেন। দেশপ্রেমিক ছবিতে তথ্যমন্ত্রীকে যে ভাবে উপস্থান করা হয় তা নিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের আপত্তি খালেদা জিয়ার কাছ পর্যন্ত পৌঁছায়। তিনি তখন বলেন, এ ব্যাপারে জুরি বোর্ড যা সিদ্ধান্ত দিবে তাই হবে।’
তিনি আরও বলেন, “এমনকি হুমায়ুন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’র কিছু বিষয় নিয়ে অনেকের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সেটিকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আটকানো হয়নি খালেদা জিয়ার আমলেই।’
পাপ্পু জানান, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার জীবনী নিয়ে সরকারি অনুদানে চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা প্রথম নেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯৫ সালে তিনি নিজে উপস্থিত থেকে ‘বেগম রোকেয়া’ চলচ্চিত্রের মহরত করেন। এটাই একমাত্র চলচ্চিত্রের মহরত যেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। নাম ভূমিকায় শাবানা ও পরিচালক সুভাষ দত্ত নির্ধারিত হলেও সরকার পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। একজন নারী নেত্রী হিসেবে আরেকজন নারীর প্রতি সম্মান ও উদারতার দৃষ্টান্ত তিনি এখানেও রাখেন।
তিনি আরও জানান, বিরোধী মতের প্রতি উদারতার আরেকটি বড় উদাহরণ—২০০৩ সালে তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতা পদক প্রদান করেন দলমতের উর্ধ্বে গিয়ে।
খালেদা জিয়া তার তৃতীয় শাসনামলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান প্রধান কার্যালয় নির্মাণ করেন। এছাড়া প্রথম শাসনামলে শিল্পকলা একাডেমিকে ঢাকা থেকে বিকেন্দ্রিকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে জেলা, উপজেলা পর্যায়ে শিল্পকলার শাখা প্রসারিত হয়।
তিনি তার স্বামী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, নতুন কুঁড়ি ও চলচ্চিত্রে অনুদান পুনরায় চালু করেন। শুরুর দিকে চলচ্চিত্রে ১ থেকে দেড় লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হত। সে টাকা তিনি ১৯৯৪-৯৫ অর্থ বছর থেকে ১১ লাখ টাকায় উত্তীর্ণ করেন।


