ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের আগের প্রতিশ্রুতি ও জুলাই সনদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে ১৮০ ডিগ্রি ইউটার্ন নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে জয়ের পর মেজরিটির ক্ষমতার জোরে সরকার সমস্ত সংস্কার প্রক্রিয়াকে অস্বীকার করছে। এটি কোনো দায়িত্বশীল ও সৎ রাজনৈতিক দলের কাজ হতে পারে না।’
রোববার বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর মিডিয়া, ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক পলিসি ‘তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার: একটি জনমুখী ও সংস্কারমূলক রোডম্যাপ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে।
বিশিষ্ট লেখক ও দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক আবুল আসাদের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইস্টার্ন নিউমেক্সিকো ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ড. খাদেমুল ইসলাম হৃদয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়া ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে সরকারের অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ আলোচনার পর গৃহীত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন লাভ করে। প্রায় ৫ কোটি মানুষ এসব প্রস্তাবের পক্ষে মত দেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারাও তখন এর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অভিযোগ করেন, নির্বাচনের পর সরকার আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন আয়োজনের স্বার্থে তারা ওই প্রক্রিয়ায় সম্মতি দিয়েছিলেন। এখন তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের আইনিভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এটি ‘জাতির সঙ্গে শুভঙ্করের ফাঁকি ও রাজনীতির মারপ্যাঁচ’।
তিনি আরও বলেন, পার্লামেন্টের কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ বিধির আওতায় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান একটি মূলতবি প্রস্তাব এনেছেন। সেখানে এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক ডেকে গণভোটে সমর্থিত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়ে এসব প্রস্তাব অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করাই হবে গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
তথ্য ও সম্প্রচার খাতের সংস্কার নিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, ঐক্যমত্য কমিশনে এই খাতের সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে ৬২টি প্রস্তাব এসেছিল। যাচাই-বাছাই শেষে প্রধান প্রধান ৬-৭টি বিষয়ে আলোচনা হয়। এগুলো হলো— গণমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসন, বিজ্ঞাপনের স্বচ্ছতা, মিডিয়া কমিশন, সাংবাদিকদের সুরক্ষা, আইনের উন্নয়ন ও ডিজিটাল মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ।
তিনি বলেন, নির্বাচনের তাড়াহুড়ো ও গণভোটের ডামাডোলে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটির সংস্কার প্রস্তাব আর আলোর মুখ দেখেনি।
গণমাধ্যমের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার ব্রিটিশ আমলের মাওলানা আকরাম খাঁ সম্পাদিত ‘দৈনিক আজাদ’ এবং তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত ‘দৈনিক ইত্তেফাক’-এর অবদান স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘আজাদ পাকিস্তান আন্দোলনে ও ইত্তেফাক বাংলাদেশ স্বাধীন করার আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছিল। এদের পেছনে কোনো কর্পোরেট বা বাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল না। বর্তমানে গজিয়ে ওঠা মিডিয়াগুলোর পেছনে গ্রিন রুম থাকে। সেখান থেকে নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ তৈরি করা হয় তাদের কর্পোরেট ও কালো টাকা রক্ষার উদ্দেশ্যে।’
বর্তমান সময়ের সোশ্যাল মিডিয়া ও এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বর্তমান যুগ এক গভীর নৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো এডিটোরিয়াল পলিসি বা বোর্ড না থাকায় দেদারসে ফেক নিউজ, মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন ছড়ানো হচ্ছে। এটি মানুষের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সাংবাদিকতাকে ‘ব্যারোমিটার অব সিভিলাইজেশন’ বা সভ্যতার মাপকাঠি উল্লেখ করে তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইকোনমিস্ট’, ‘টাইম’ বা ‘নিউজউইক’-এর উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, থার্ড ওয়ার্ল্ড বা মুসলিম দেশগুলোর ইস্যুতে এসব বড় মিডিয়াও অনেক সময় জাস্টিস করতে পারে না। এটি বৈশ্বিক মোরাল ক্রাইসিসের অংশ।
সবশেষে ‘ফ্রিডম অব স্পীচ’ বা মুক্তচিন্তার সীমা থাকা উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মুক্তচিন্তা মানেই লাগামহীনতা নয়। বাংলাদেশ একটি ৯০ ভাগের বেশি মুসলিম মেজরিটির দেশ। এদেশের একটি নিজস্ব কালচার, কৃষ্টি ও মূল্যবোধ আছে। মুক্তচিন্তার নামে কারো হৃদয়ে, আদর্শে, ধর্মে বা চরিত্রে আঘাত করার অধিকার কারো নেই। স্বাধীনতাকে অবশ্যই নৈতিকতার সীমানা দিয়ে আটকাতে হবে। তা না হলে পশ্চিমা সংস্কৃতির সর্বনাশা ছোবলে আমাদের তরুণ প্রজন্ম ও নতুন সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।’
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, গ্রীন ওয়াচ-এর সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক আযম মীর, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সেক্রেটারি কাদের গণি চৌধুরি, ঢাকামেইলের সম্পাদক হারুন জামিল, মানবকণ্ঠের সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রফিক রুম্মানসহ অন্যরা।


