গাইবান্ধায় ক্রেতা সংকট এবং ন্যায্য দাম না পেয়ে মহাসড়কের পাশেই কোরবানির পশুর শত শত চামড়া ফেলে গেছেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। সিন্ডিকেটের কারণে চামড়ার বাজার ধসে পড়েছে জানিয়ে জেলার ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, এতে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা।
জানা গেছে, এবার ঈদুল আজহায় গাইবান্ধায় এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল। বৃহস্পতিবার ঈদের দিন দুপুরের পর থেকেই উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়া হাট জেলার পলাশবাড়ী শহরের কালিবাজারে চামড়া নিয়ে আসতে শুরু করেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা।
অন্যদিকে বিভিন্ন এতিমখানা ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ দান করা কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করতে শুরু করে। দুইদিন ধরে প্রতিষ্ঠানগুলো চামড়া ক্রেতার অপেক্ষা করেও ক্রেতা না পেয়ে মহাসড়কের পাশে অবস্থান নেয়। সেখানেও ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মহাসড়কেই চামড়া ফেলে রেখে চলে যান তারা।
পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি চরম বিপাকে পড়েছেন জেলার সাধারণ চামড়া ব্যবসায়ীরাও।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার চাপাদহ গ্রামের ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী মানিক চন্দ্র রবিদাস (৫৫)। তিনি প্রতিবছর ঈদুল আজহার দিন বাইসাইকেল নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে চামড়া কেনেন। পরে জেলার ঐতিহ্যবাহী চামড়ারহাট পলাশবাড়ী হাটে ঢাকা থেকে আসা পাইকারদের কাছে সেই চামড়া বিক্রি করেন।
তিনি জানান, পলাশবাড়ীতে পরবর্তী হাট বসবে আগামী বুধবার। ঈদের দিন বড় পাইকাররা আসেননি। তারপরও তিনি পলাশবাড়ীর স্থানীয় পাইকারদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে নিয়ে গিয়েছিলেন। পলাশবাড়ী হাটে চামড়া নিয়ে দুইদিন অপেক্ষা করলেও কেউ ন্যায্য দাম বলেননি।
মানিক চন্দ্র রবিদাস বলেন, ‘ঈদের দিন ধার দেনা করে প্রায় ৪০ হাজার টাকার গরুর চামড়া কিনেছি। গাইবান্ধায় এবার ঈদে পশুর চামড়ার দাম অনেকটা কম। স্থানীয় চামড়ার পাইকারি আরত গুলোতে চামড়ার আমদানি প্রচুর। কিন্তু পাইকাররা চামড়া কিনছেন না। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ধারদেনা করে চামড়ার ব্যবসায় লগ্নি করেছেন। সেই চামড়া তারা বিক্রি করতে পারছেন না। চামড়া কিনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন।’

পলাশবাড়ী উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী হরিপদ দাস (৫৫) জানান, তিনি ঈদের দিন পার্শ্ববর্তী কুমারগাড়ি গ্রামে বাইসাইকেল নিয়ে গ্রাম ঘুরে ঘুরে চামড়া কেনেন। বলেন, ‘ঈদের দিন ৫০ হাজার টাকার গরুর চামড়া কিনেছি। বিকালে গাইবান্ধা শহরের একটি চামড়ার আড়তে বিক্রি করতে নিয়ে গিয়েছিলাম। পাইকারদের কেউ দামই করেননি। পরেরদিন পলাশবাড়ীর হাটে নিয়ে যাই। সেখানেও কোনও ক্রেতা চামড়া দাম করেন নাই। পাইকারেরা বলছেন, চামড়া কিনে কী করব? আমরা বিক্রি করব কোথায়?’
চামড়া বিক্রি করতে না পেয়ে আবার বাড়িতে ফিরিয়ে আনার কথা জানালেন এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘বাড়ি এনে চামড়ায় লবণ দিয়ে রেখেছি। পরে বিক্রি করেও লাভ করতে পারব কিনা চিন্তায় আছি।’
স্থানীয় চামড়ার পাইকাররা জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রতি ঈদের পর যেদিন বুধবার পড়ে, সেই বুধবারই পলাশবাড়ী হাট বসে। এ হিসাবে আগামী বুধবার (৩ জুন) পলাশবাড়ী চামড়ার হাট বসার কথা রয়েছে। এখানে গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের আটটি জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে রিকশা-ভ্যান ও ভটভটিতে করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চামড়া বিক্রি করতে আনেন। কিন্তু এবার ঈদের পরদিন থেকেই এই হাটে চামড়া উঠতে শুরু করেছে। তবে মূল ক্রেতারা বুধবারের অপেক্ষা করছেন।
পলাশবাড়ী চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির নেতা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রতিবছর হাটেরদিন ঢাকা থেকে ট্যানারির মালিকেরা চামড়া কিনতে আসেন। আগামী বুধবারও তাদের আসার কথা। তাদের চাহিদার উপর চামড়ার বাজার অনেকটা নির্ভর করছে।’
চামড়া ব্যবসায়ীরা জানালেন, সরকার এবার ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৫৫ টাকা ও ছাগলের চামড়া ১২ থেকে ১৫ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা গ্রাম ঘুরে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া ৬০-৬৫ টাকা ও ছাগলের চামড়া ১৮-২০ টাকা দামে কিনেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী বলেন, ‘দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চড়া সুদে ৩৫ হাজার টাকা নিয়ে চামড়া কিনেছি। চামড়া কিনে বিপদে পড়েছি। কোনো মহাজন ছাগলের চামড়ার দামই করছেন না।’
গাইবান্ধা শহরের চামড়া ব্যবসায়ী আরশাদ আলী মুঠোফোনে বলেন, ‘ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে চামড়া কিনেছেন । ফলে তাদের কাছ থেকে বেশি দামে চামড়া কিনতে মহাজনরা আগ্রহী হচ্ছেন না।’
এ ছাড়া এবার লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত পশুর চামড়া পাওয়া যাচ্ছে। কাজেই স্থানীয় পাইকাররা চামড়া কিনতে ভয় পাচ্ছেন।
চমড়ার ক্ষুদ্র ও পাইকারী ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন মন্তব্য করলেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের কারনে চামড়া দাম পাচ্ছেন না বিক্রেতারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক মাদ্রাসার শিক্ষক বলেন, ‘অনেক আগে থেকে প্রতিবছর আমাদের মাদ্রাসায় অনেকে কোরবানির পশুর চামড়া দিয়ে যায়, আবার অনেকে ফোন দিলে ছাত্রদের পাঠিয়ে সংগ্রহ করি। গত দুইদিন থেকে কোন চামড়া ক্রেতা যায়নি। তাই ভ্যানে করে চামড়া গুলো মহাসড়কে নিয়ে আসছিলাম। পাইকার যাওয়ার পথে যদি কিনে নিয়ে যায়। সারাদিন অপেক্ষা করে পাইকার পাই নাই। তাই রেখে চলে যাচ্ছি। এগুলো আবার খরচ করে ফিরিয়ে নিতে টাকার প্রয়োজন। এমনিতেই মাদ্রাসার হুজুর দেখলে অনেকেই কটাক্ষ করে।’
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, ‘দুইজন ছাত্র নিয়ে সারাদিন রাস্তায় ছিলাম। আমাদের দেশে কোরবানির সময় চামড়ার দাম কমানো আর না কেনার কারণ দানে চলা প্রতিষ্ঠান গুলো যেন অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এজন্য তারা ওই কৌশল অবলম্বন করে থাকে।’


