কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় পশুর হাটগুলোতে নতুন ইজারাদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন বিএনপি নেতারা। পদধারী নেতারা কোথাও নিজ নামে ইজারা নিয়েছেন, আবার কোথাও হাট দখল করেছেন অন্যের নামে। বিএনপি নেতাদের দাপটে সর্বোচ্চ দর দিয়েও অনেকে হাটের দখল পাননি। অন্য রাজনৈতিক দলের লোকজন ইজারা পেলেও তাদের বিশেষ সমঝোতায় আসতে হয়েছে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে পশুর হাটে এবছর আওয়ামী লীগের নেতাদের দাপট নেই। পুরনো সিন্ডিকেট সদস্যরা হাট ইজারার চেষ্টাও করেননি। এ অবস্থায় হাট ইজারায় এসেছে নতুন মুখ, তবে তাদের কেউই ‘অরাজনৈতিক’ নন। অস্থায়ী হাটের এ কারবার বরাবরই রাজনৈতিক প্রভাবশালীরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।
এবারের কোরবানির ঈদে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ইজারার ভিত্তিতে মোট ২১টি অস্থায়ী পশুর হাট বসার কথা রয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ১২টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় বসবে ৯টি অস্থায়ী হাট। তবে জনবহুল স্থান হওয়ায় দক্ষিণ সিটির আফতাবনগর ও মেরাদিয়া এবং উত্তর সিটির বাড্ডা ও খিলক্ষেতে হাট বসাতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ কারণে উত্তর সিটি আরও দুটি স্থানে হাট বসাতে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এ অবস্থায় গাবতলী ও সারুলিয়ায় দুটি স্থায়ী হাটসহ এবার রাজধানীতে পশুর হাট বসতে পারে ২৩টি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এরই মধ্যে বেশির ভাগ হাটের ইজারা চুড়ান্ত হয়েছে। ঈদুল আজহার দিনসহ মোট পাঁচদিন নির্ধারিত স্থানে কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে।

জানা যায়, পশুর হাটের ইজারায় এবার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিএনপি নেতারা। রাজধানীর গাবতলী গরুর হাটের দখল নিয়েছেন বিএনপি নেতা সোহেল রহমান। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের দরপত্রে পঞ্চম হয়েও বিএনপি নেতা এস এ সিদ্দিক সাজুর হয়ে হাটটি দখলে নিয়েছেন তিনি। নীতিমালা ভঙ্গ করে খাস আদায়ের নামে এমন দখলকেই পৃষ্ঠপোষকতা করছে খোদ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ দরদাতারা।
হাট সংশ্লিস্টরা জানান, সোহেল রহমান ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং দারুসসালাম থানা বিএনপির আহ্বায়ক এস এ সিদ্দিক সাজুর কর্মী হিসেবে পরিচিত। সিদ্দিক গাবতলি গরুর হাটের দরপত্রে অংশ নিয়ে পঞ্চম হয়েছেন। অথচ দরপত্রে প্রথম হয়েও হাটে ঢুকতে পারছে না আরাত মটর। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের একাধিক নথিপত্র বলছে, আরাত মটর সর্বোচ্চ দরদাতা, তাকে হাটের ইজারা বুঝিয়ে দিতে সুপারিশ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। মূলত বিএনপি নেতা এস এ সিদ্দিক সাজু এক বছরের জন্য ২২ কোটি টাকা দিয়ে এ হাটের ইজারা নিয়েছেন।
তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন অস্থায়ী হাটের ইজারা পেয়েছে জায়ান এন্টারপ্রাইজ। এ প্রতিষ্ঠানটির মালিক তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব নয় বৈধ উপায়ে তিনি হাটের ইজারা পেয়েছেন বলে দাবি করেন।
মনিরুজ্জামান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সুন্দরভাবে হাটটি পরিচালনা করতে চাচ্ছি, সব রকম প্রস্তুতি নিয়েছি। ব্যাপারীদের নিরাপত্তা ও হাটের নিরাপত্তার স্বার্থে সিসিটিভি লাগানো হয়েছে। পুলিশের সাথে সকল বিষয় নিয়ে কথা বলেছি। সব কিছুই নিয়মমাফিক হয়েছে এবং হবে।’
খিলক্ষেত মস্তুল চেকপোস্ট-সংলগ্ন খালি জায়গায় সুরমি এন্টারপ্রাইজের নামে মজিবুল্লা খন্দকার হাটের ইজারা নিয়েছেন। তবে হাটটি পরিচালনা করছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আকতার হোসাইন। আর ঢাকা পলিটেকনিকের খেলার মাঠের হাটটি ডিএসসিসি প্রথমে সর্বোচ্চ দরদাতাকে বাদ দিয়ে ৭৭ লাখ টাকা কমে তৃতীয় সর্বোচ্চ দরদাতা এসএফ করপোরেশনকে ইজারা দিতে কার্যাদেশ প্রস্তুত করলেও সমালোচনা মধ্যে হাটটির ইজারা পুনঃবিবেচনা করছে। হাটটি এখন সর্বোচ্চ ২ কোটি ১৭ লাখ টাকায় জায়ান এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী যুবদল নেতা মনিরুজ্জামান পেয়েছেন।

মিরপুর কালশী বালুর মাঠের খালি জায়গা সংলগ্ন হাটটিতে সরকারি মূল্যের চেয়ে ৫০ লাখ টাকা কমে ৩০ লাখ ২০ হাজার টাকায় সর্বোচ্চ দর দিয়েছেন ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান।
ভাটুলিয়া সাহেব আলী মাদ্রাসা হতে ১০ নম্বর সেক্টর রানাভোলা অ্যাভিনিউ সংলগ্ন উত্তরা রানাভোলা সুইচগেট পর্যন্ত হাটটির সর্বোচ্চ ৯৫ লাখ টাকা দর দিয়েছেন মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আতিকুর রহমান। মিরপুর ইস্টার্ন হাউজিং হাটটি প্রথম পর্যায়ের ইজারায় বিএনপি ও জামায়াতের দুই নেতা ২ কোটি টাকা সমমূল্য দেওয়ায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ইজারা অনুষ্ঠিত হয়। হাটটি এবার সর্বোচ্চ দরে ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় পেয়েছেন মেসার্স সোহাগ এন্টারপ্রাইজের রতন মিয়া।
মোহাম্মদপুর বছিলার পশুর হাটটিতে সর্বোচ্চ ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা দর দিয়েছেন মোহাম্মদপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জালাল মৃধা। ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাঁচকুড়া বাজার সংলগ্ন রহমান নগর আবাসিক এলাকার হাটের ইজারায় সর্বোচ্চ ১৩ লাখ টাকায় আরহাম এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী বিএনপি নেতা শাহ মিরাজ দর দিয়েছেন। ভাটারা সুতিভোলা খাল সংলগ্ন হাটটিতে তামিম এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম সরকারি মূল্যের চেয়ে ৭০ লাখ টাকা কমে সর্বোচ্চ ৩ কোটি টাকা দর দিয়েছেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তা ফারজানা খানম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘অধিকাংশ হাটে কাঙ্ক্ষিত দর পেয়েছে ডিএনসিসি। আশা করি যথাসময়ে হাটে পশু বেচাবিক্রি শুরু হবে।’ তিনি হাট ইজারায় অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের কথা অস্বীকার করেন।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শাহজাহানপুর-খিলগাঁও রেলগেট বাজারের মৈত্রী সংঘ ক্লাবসংলগ্ন খালি জায়গার সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এ বছর হাটটি ইজারা নিতে অংশগ্রহণ করেছে দুটি প্রতিষ্ঠান। শিকদার এন্টারপ্রাইজ এ বছর সর্ব্বোচ্চ দর দিয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজির পুর্ব পাশের খালি জায়গার হাটটির দর সরকারি মূল্য ৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। দুই অংশগ্রহণকারীর মধ্যে সাব্বির এন্টারপ্রাইজের সর্বোচ্চ দর দিয়েছে ৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।
মেরাদিয়া বাজারের পূর্ব পাশের খালি জায়গার সরকারি মূল্য ছিল ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা। তিনজন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে সর্বোচ্চ দর ছিল ফেরদৌস আহমেদের, তিনি দর দিয়েছিলেন ৩ কোটি ৪ লাখ টাকা। হাইকোর্ট এ হাটটি বসাতে স্থগিতাদেশ দিয়েছে।
আমুলিয়া আলীগড় মডেল কলেজের উত্তর পাশের খালি জায়গার হাটের সরকারি মূল্য ৫৩ লাখ টাকা। তিনজন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে জয়নায় আবেদিন নামের একজন সর্বোচ্চ ৫৫ লাখ টাকা দর দেন। শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ডসংলগ্ন খালি জায়গার সরকারি মূল্য প্রায় ৬৭ লাখ টাকা। দুজন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে নাজমুল আলম সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা দর দেন। সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গা ও ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনালের সরকারি মূল্য ৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এ হাটে তুষার আহমেদ ইমরান ২ কোটি টাকা ইজারামূল্য দিয়ে অংশগ্রহণ করেন। ডিএসসিসির পোস্তগোলা শ্মশানঘাটসংলগ্ন খালি জায়গার অস্থায়ী হাটের সরকারি মূল্য ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ইজারায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ দর দিয়েছেন মোহাম্মদ আলী মিলন, ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী বলেন, ‘এ বছর পশুর হাটের ইজারা নিতে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, গণ অধিকার পরিষদের নেতারাসহ অনেকেই এসেছেন। সর্বোচ্চ দরদাতাই ইজারা পেয়েছেন। সরকারি মূল্যের চেয়ে যেসব হাটে কম মূল্য উঠেছে, সেগুলো নিয়ম অনুযায়ী দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে যাবে।’


