আগামী বছরের শুরুতে দলীয় জাতীয় কাউন্সিল করার লক্ষ্য নিয়ে সাংগঠনিক কাজ আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নিচ্ছে বিএনপি। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই দলের ভেতরের কোন্দল মেটানো, তৃণমূলের শক্তি বাড়ানো এবং নেতাকর্মীদের মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় করতে পুনর্গঠন করা হচ্ছে বিএনপিসহ এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি একাধিক বৈঠকে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্বশীল নেতাদের এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এরই মধ্যে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়া কমিটিগুলো নতুন করে গড়ার কাজ শুরু হয়েছে। চলতি মাসেই জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদের চলতি বাজেট অধিবেশন শেষ হওয়ার পর তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির মূল দল পুনর্গঠনের কাজ পুরোদমে শুরু হবে।
হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেখানে সুযোগ রয়েছে সেখানে কাউন্সিলের মাধ্যমে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হবে। জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ধাপে ধাপে এই সম্মেলনগুলো করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দলটির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দলের সাংগঠনিক কাজ ও মাঠের রাজনীতিতে কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। সে কারণেই তারেক রহমান সংগঠনকে আরও সক্রিয় করে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে সাংগঠনিক সম্পাদকদের নির্দেশ দিয়েছেন
এই উদ্দেশ্যে গত শনিবার বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি, ঢাকা জেলা বিএনপি এবং জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে সামনে হতে যাওয়া ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে মাথায় রেখে মহানগর বিএনপিকে আরও সক্রিয় করার নির্দেশ দেন তিনি।
দলীয় সূত্র জানায়, তারেক রহমান পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, জেলা-থানা কমিটি এবং বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাদের সঙ্গেও এমন বৈঠক করবেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, চলতি জুলাই মাসের শেষের দিকে অথবা আগস্ট মাস থেকে মেয়াদ পার হওয়া কমিটিগুলো পুনর্গঠনের কাজ শুরু হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পর পর এই কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নানা বাধা-বিপত্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি।
তবে এই দীর্ঘ সময়ে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি কয়েকবার পুনর্গঠন করা হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। এরপর তার নেতৃত্বেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে সরকার গঠন করে।
জাতীয় কাউন্সিল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে দল পুনর্গঠন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া এবং যা কিছু করার তা কাউন্সিলের মাধ্যমেই করা হবে।
দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, দল পুনর্গঠন নিয়ে চেয়ারম্যানের পরিষ্কার নির্দেশনা রয়েছে যে সব কমিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে করতে হবে। এই দায়িত্ব সাংগঠনিক সম্পাদকদের দেওয়া হয়েছে। সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়ে সরকারের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরও মজবুত করতে নেতাকর্মীরা জোরালো ভূমিকা রাখবেন।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় কাউন্সিলের আগেই তৃণমূল থেকে শুরু করে সব কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। সর্বশেষ সাংগঠনিক সভায় পার্টির চেয়ারম্যান তাদের এই নির্দেশই দিয়েছেন। সংসদের বাজেট অধিবেশন শেষ হলেই তৃণমূলে পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে।
গত শনিবারের বৈঠকের বিষয়ে জানা যায়, তারেক রহমান প্রথমে ঢাকা জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন, যেখানে সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায়ের নেতৃত্বে জেলার নেতারা উপস্থিত ছিলেন। নিপুণ রায় টাইমসের কাছে বৈঠকের কথা নিশ্চিত করলেও আলোচনার বিষয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এরপর জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ তিন নেতা—সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহমদ, সিনিয়র সহ-সভাপতি ইয়াসিন আলী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসানের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বিএনপি চেয়ারম্যান। সেখানে তিনি দেশের সব কমিটির খোঁজখবর নেন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের আভাস দেন। বর্তমানে বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে কেবল যুবদলের কমিটি ছাড়া বাকি ১০টিরই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
এই বৈঠকে উপস্থিত এক নেতা টাইমস’কে জানান, তাদের সঙ্গে মূলত নতুন কমিটি গঠন নিয়েই কথা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট তারিখ না জানালেও ধারণা করা হচ্ছে খুব দ্রুতই নতুন কমিটি আসবে। এ ছাড়া জেলা পর্যায়ের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো দ্রুত ও কোনো বিতর্ক ছাড়া পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এরপর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু এমপি ও সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনের সঙ্গে প্রায় আধা ঘণ্টা বৈঠক করেন তারেক রহমান। সেখানে সংগঠনের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত এক নেতা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাদের বলেছেন তিনি দলকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে চান। এজন্য এখন থেকে তিনি সংগঠনের জন্য নিয়মিত সময় দেবেন।
বৈঠক সূত্র আরও জানায়, তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, দীর্ঘদিনের পুরনো কমিটিগুলো দ্রুত পুনর্গঠন করতে হবে। যেখানে সম্ভব কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব ঠিক করতে হবে, যাতে দল আরও গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য হয়।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু টাইমস’কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নিয়ে দলীয় কার্যক্রম বাড়িয়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন জানান, সামনে ঢাকা সিটি নির্বাচন থাকায় থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের দুর্বল ইউনিটগুলোকে সক্রিয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ঢাকা মহানগর কমিটি ভাঙা বা পুনর্গঠন নিয়ে কোনো কথা হয়নি।
সবশেষে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন টাইমস’কে বলেন, বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করা না হলেও এর প্রস্তুতি চলছে। তবে বছরের শেষের দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে জানান দলের এই সিনিয়র নেতা।


