সকাল আটটায় স্কুলের গেট দিয়ে যখন শরিফ (ছদ্মনাম) ভেতরে প্রবেশ করেন, তখন তিনি একজন মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু রাত দশটায় যখন তিনি শেষ ব্যাচের কোচিং করিয়ে বাসায় ফেরেন, তখন তিনি কেবল এক ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত মানুষ। মাত্র ১২,৫০০ টাকা বেতনে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকের কাছে জীবনের হিসাব আর আদর্শের সংঘাত এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। এটি কেবল শরীফের একার গল্প নয়! বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা হাজার হাজার শিক্ষকের রূঢ় বাস্তবতা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। অথচ বেসরকারি শিক্ষকদের বড় একটি অংশের বেতন রয়ে গেছে তলানিতে। বেসরকারি এমপিওভুক্ত একজন এন্ট্রি লেভেলের শিক্ষকের মূল বেতন ১২,৫০০ টাকা (গ্রেড-১১)। এর সাথে নামমাত্র বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা যোগ হলেও তা একটি পরিবারের পাঁচ দিনের খরচ মেটাতেও হিমশিম খেতে হয়।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, ঢাকা বা বিভাগীয় শহরগুলোতে চার সদস্যের একটি পরিবারের ন্যূনতম সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য মাসিক অন্তত ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা প্রয়োজন। সেখানে ১২,৫০০ টাকার বেতনকে অনেক শিক্ষক ‘সামাজিক কৌতুক’ হিসেবেই দেখছেন।
নীতিনির্ধারকরা প্রায়ই ‘কোচিং বাণিজ্য’ বন্ধের হুঁশিয়ারি দেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষকরা কোচিং করান টিকে থাকার তাগিদে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৫% শিক্ষক বাড়তি আয়ের জন্য টিউটরিং বা কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল।
ইউনেস্কো’র ‘গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ভারত ব্যতীত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে শিক্ষকদের বেতন কাঠামো জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় ব্যক্তিগত টিউটরিং একটি সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
শিক্ষকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করে পরিবারের ন্যূনতম ভরণপোষণ জোগাড় করতে না পারেন, তবে তাদের থেকে গুণগত পাঠদান আশা করা অবাস্তব।
শিক্ষকদের মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শিক্ষার মান উন্নত করার একাধিক আন্তর্জাতিক উদাহরণ রয়েছে। ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বের সেরা বলা হয়। সেখানে একজন শিক্ষকের বেতন একজন ডাক্তার বা আইনজীবীর সমপর্যায়ভুক্ত। তাদের সামাজিক মর্যাদা এতোটাই বেশি যে, মেধাবী শিক্ষার্থীরাই এই পেশায় আসেন। ফলে সেখানে কোনো কোচিং সেন্টারের অস্তিত্ব নেই। সিঙ্গাপুরে শিক্ষকদের পারফরম্যান্স বোনাস এবং নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি নিশ্চিত করা হয়। তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ায় তারা ক্লাসেই শতভাগ মনোযোগ দিতে পারেন। ভিয়েতনাম উদীয়মান এই দেশটি শিক্ষকদের আবাসন ও স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ ভর্তুকি দেয়, যাতে তাদের বেতনের টাকা কেবল সঞ্চয় বা অন্য কাজে ব্যয় হতে পারে।
বিশেষজ্ঞের মতে, কোচিং বন্ধের আইনি নির্দেশের চেয়ে গোঁড়ায় নজর দেওয়া জরুরি। সমাধান হিসেবে কয়েকটি প্রস্তাব বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত: শিক্ষকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র পে-স্কেল বা মর্যাদা অনুযায়ী বেতন কাঠামো গঠন করা, যা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত: আবাসন ও স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থা করা, যাতে বেতনের বড় অংশ ভাড়ায় চলে না যায়।
তৃতীয়ত: শিক্ষকদের ওপর থেকে কোচিংয়ের চাপ কমাতে স্কুলের পাঠদান প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর এবং আধুনিক করা।
একজন শিক্ষক যদি নিজের জীবন চালাতে অক্ষম হন, তবে তিনি অন্যের জীবন গড়ার কারিগর হিসেবে নিজেকে কতক্ষণ নিয়োজিত রাখতে পারবেন? কোচিং বাণিজ্য অবশ্যই শিক্ষার জন্য অভিশাপ, কিন্তু এই অভিশাপ থেকে মুক্তির পথটি শিক্ষকদের বঞ্চনা দিয়ে নয়, বরং তাদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই প্রশস্ত হতে পারে।
শরিফের চোখের নিচের কালি যদি না মোছে, তবে আগামীর প্রজন্মের চোখে শিক্ষার আলো পৌঁছানো কঠিন হবে। এমনকি ফুটপাতে বসবাস করা ব্যক্তিও এই আয়ে জীবন নির্বাহ করা সম্ভব নয়—এটি কোনো অতিরঞ্জন নয়, বরং বাস্তবতার নির্মম চিত্র।
এমন অবস্থায় একজন শিক্ষক কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখবেন? কীভাবে তিনি শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা দেবেন? কীভাবে তিনি নিজের মর্যাদা বজায় রাখবেন?
অনেকেই মনে করেন, কোচিং শিক্ষাব্যবস্থার একটি নেতিবাচক দিক। এতে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ হয়। এই যুক্তিগুলো পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শিক্ষকরা কেন কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন?
উত্তরটি খুবই সরল—বেঁচে থাকার জন্য।
যখন একজন শিক্ষক তার মূল বেতনে পরিবার চালাতে না পারেন তখন তিনি বাধ্য হন অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজতে। কোচিং তখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। এটি তার জন্য একটি বিকল্প নয়, বরং টিকে থাকার একমাত্র উপায়।
এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যদি বলা হয়—“কোচিং বন্ধ করুন”—তাহলে সেটি বাস্তবতা বিবর্জিত একটি সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে কোচিং বন্ধের উদ্যোগকে অনেক সময় শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই উদ্যোগ কি সমস্যার মূল কারণকে স্পর্শ করছে?
শিক্ষার মান নির্ভর করে শিক্ষকের মান, তার মানসিক স্বস্তি, তার আর্থিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদার ওপর। একজন শিক্ষক যদি প্রতিদিন অর্থকষ্টে ভোগেন, যদি তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাহলে তিনি কীভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য সেরাটা দিতে পারবেন?
অন্যদিকে, শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা অবহেলা, বঞ্চনার ও মবের শিকার। তাদের বেতন কম, সুযোগ-সুবিধা সীমিত, এবং অনেক সময় সামাজিক মর্যাদাও প্রশ্নবিদ্ধ।
এমন পরিস্থিতিতে কোচিং বন্ধের নির্দেশ অনেকের কাছেই “ফাইজলামি” মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
একটি রাষ্ট্র যদি সত্যিই শিক্ষার উন্নয়ন চায়, তাহলে তাকে প্রথমেই শিক্ষকদের অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে। এর অর্থ শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়; বরং একটি সামগ্রিক কাঠামোগত পরিবর্তন।
অনেক সময় নীতিনির্ধারকরা এমন সিদ্ধান্ত নেন, যা কাগজে-কলমে ভালো শোনালেও বাস্তবে কার্যকর হয় না। কোচিং বন্ধের সিদ্ধান্তও অনেক ক্ষেত্রে তেমনই একটি উদাহরণ।
যদি সত্যিই কোচিং নির্ভরতা কমাতে হয়, তাহলে প্রথমে স্কুলের পাঠদানকে এতটাই কার্যকর করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন না পড়ে। আর সেটি করতে হলে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, সময় এবং আর্থিক নিশ্চয়তা দিতে হবে।
দিনের শেষে, প্রশ্নটি খুবই সহজ—একজন শিক্ষক যদি নিজের জীবন চালাতে না পারেন, তাহলে তিনি কীভাবে অন্যের জীবন গড়বেন?
আবার ফিরে যাই শরিফের গল্পে। একদিন রাতে কোচিং শেষে বাড়ি ফিরছিল শরিফ। ক্লান্ত শরীর, মাথায় হাজারো চিন্তা। পথে সেই একই ফুটপাত। সেখানে আজও সেই ভ্যানচালক বসে খাচ্ছে।
শরিফ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর নিজের পকেট থেকে টাকা বের করে দেখে—আজকের আয়, আজকের খরচ, আর আগামীকালের অনিশ্চয়তা।
হঠাৎ তার মনে পড়ে যায়—সেদিন ক্লাসে এক ছাত্র তাকে বলেছিল, “স্যার, আমি বড় হয়ে আপনার মতো শিক্ষক হতে চাই।”
শরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে। তার মুখে এক অদ্ভুত হাসি—কষ্টের, বেদনার, আর এক চিলতে আশার।
সে ভাবে—যদি কোনোদিন এমন দিন আসে, যখন একজন শিক্ষককে টিকে থাকার জন্য কোচিং করতে না হয়, তখনই হয়তো সত্যিকার অর্থে শিক্ষা মুক্তি পাবে।
সেই দিনের অপেক্ষায় শরিফ হাঁটতে থাকে—অন্ধকার রাস্তা ধরে, আলো খোঁজার প্রত্যাশায়।
লেখক: প্রফেসর বদরুল ইসলাম
শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজ, ঢাকা


