বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাজের ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তফসিলি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা। তারা বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের টেবিলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো মাসের পর মাস আটকে আছে। এতে আর্থিক খাতের কার্যক্রম স্থিমিত হয়ে পড়েছে।
রোববার অনুষ্ঠিত হওয়া ব্যাংকার্স সভায় এই বিষয় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তীব্র বাদানুবাদ হয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরসহ ডেপুটি গভর্নররা উপস্থিত ছিলেন।
সভার একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তীব্র বাদানুবাদের এক পর্যায়ে গভর্নর হস্তক্ষেপ করেছেন। তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে আসা যেকোনো চিঠি পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে জবাব দিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে। এর মধ্যে জবাব না পেলে এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্মত বলে ব্যাংকগুলোকে ধরে নিতে বলেছেন গভর্নর।
তফসিলি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকার্স সভা আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখানে ব্যাংক খাতের চলমান বিষয় নিয়ে মতবিনিময় হয়।
সভায় অংশগ্রহণকারী একাধিক এমডি টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছে, এবারের ব্যাংকার্স সভায় খেলাপি ঋণের জন্য নীতি সহায়তা, সিএমএসএমই ঋণ, ন্যানো ঋণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তবে আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত না পাওয়ার বিষয়টি।
বিশেষ করে অভিযোগের আঙ্গুল তোলা হয়েছে ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহাম্মদের দিকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সংক্রান্ত সকল বিভাগ এই কর্মকর্তার অধীনে রয়েছে।
‘ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদের টেবিলে শত শত ফাইল সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় মাসের পর মাস পড়ে থাকে। তিনি ওভার রেগুলারাটাইজ করতে গিয়ে সকল কার্যক্রম স্থবির করে দিচ্ছেন। এভাবে ব্যাংক খাত কোনো দিন ভালো চলতে পারে না,’ বলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এমডি।
সভায় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়। গভর্নর বলেন, ‘আমরা সকল খারাপ ঋণ কার্পেটের নিচ থেকে বের করে নিয়ে এসেছি। এতে ব্যাংক খাতের বাস্তব চিত্র দৃশ্যমান হয়েছে। চলমান নীতি সহায়তার আওতায় খেলাপিদের ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করে দিলে ডিসেম্বরে খেলাপির হার কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন আহসান এইচ মনসুর।’
ব্যাংকের এমডিদের কেস টু কেস ভিত্তিতে খেলাপি গ্রাহকরেদ নীতি সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। খেলাপি ঋণ কমিয়ে ব্যাংকের দায় কমানোর স্বার্থে ব্যাংকের এমডিদের দিক থেকে আন্তরিকতা আশা করেন গভর্নর।
এ প্রেক্ষিতে একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বলেন, নীতি সহায়তা প্রদান করতে গিয়ে যে সমস্যার মুখে পড়তে হয় তা সভায় তুলে ধরা হয়েছে। কারণ, যারা নীতি সহায়তা নিতে আসছেন তাদের একটি বড় অংশেরই বাধ্যতামূলক ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দেওয়ার সক্ষমতা নেই।
তিনি আরও বলেন, নীতি সহায়তা অনুমোদনের আগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আবেদনকারীদের আগামী ১০ বছরের নগদ প্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) দেখতে হয়।
‘বাস্তবতা হচ্ছে, তাদের অধিকাংশেরই কোনো নগদ প্রবাহ নেই, যা নিবন্ধিত নিরীক্ষকের মাধ্যমে প্রত্যয়ন করার কথা। প্রকৃতপক্ষে, তাঁদের বেশিরভাগই এ ধরনের সহায়তার যোগ্যই নন,’ ওই এমডি বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘যদি আমরা কাল্পনিক ক্যাশ-ফ্লো হিসাবের ওপর ভিত্তি করে তাঁদের সহায়তা দিই, তাহলে আমরা নতুন সমস্যায় পড়ব—যা কোনো ব্যাংকারই চান না।’
বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশই খেলাপি, টাকার অঙ্কে যা ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি। এর মধ্যে নীতি সহায়তার অধীনে ২ লাখ কোটি টাকা নিয়মিত করার জন্য আবেদন রয়েছে।
সভায় কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণের (সিএমএসএমই) ক্ষেত্রে প্রভিশন সংরক্ষণের হার নিয়ে আপত্তি উত্থাপন করেন কয়েকজন এমডি। সম্প্রতি এই ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের হার শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে চার গুণ বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। অর্থাৎ ১০০ টাকা সিএমএসএমই ঋণ বিতরণ করলে এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ১ টাকা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। অন্যান্য ঋণের ক্ষেত্রেই এই হার ১ শতাংশ।
কয়েকজন এমডি বলেন, প্রভিশন বাড়ানোয় ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ঋণ বিতরণে অনুৎসাহিত হবে। তারা বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ জানালেও তাতে সাড়া দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত পরিপালন করতে গিয়েই এই খাতে বিশেষ সুবিধা কমাতে হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে।


