গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় কুকুরের কামড়ে আহত ১৪ জনই ভ্যাকসিন নিয়েছিলেন। ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও তাদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতের স্বজনরা বলছেন, আক্রান্ত হওয়ার পরই ভুক্তভোগীদের ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা ও হাসপাতালে নিয়ে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। তাদের জানা মতে, কুকুর কামড়ানোর পর তারা সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। তবে চিকিৎসকদের মতে, যথাযথ চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় ঘাটতি থাকায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের কঞ্চিবাড়ী ঘুরে দেখা গেছে, কুকুরের কামড়ে নিহত-আহত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয়রা আতঙ্কে আছেন। একটি কুকুরের কামড়ে এতোগুলো মানুষের মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোক নেমে এসেছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধুবনী বাজার গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন ফুল মিয়া। তিনি কুকুরের কামড়ে মারা যান। তার স্ত্রী জমিলা খাতুন বলেন, ‘গত ২২ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আমার স্বামী বাড়ির পাশের জমিতে পাটক্ষেত নিরানির (আগাছা পরিষ্কার) কাজ করছিলেন। এমন সময় একটি কুকুর এসে তার নাকে কামড় দেয়। তিনি নাগ চেপে ধরে বাড়িতে আসেন। নাক দিয়ে রক্ত পড়ছিল। এরপর কয়েক মিনিট শুধু গরম পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করতে থাকি। সাবান দেইনি। কিন্তু রক্ত বন্ধ না হওয়ায় তাকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে নাকে সেলাই দেওয়া হয়। এরপর হাসপাতাল থেকে একটি ও বাইরে থেকে আরেকটি কিনে মোট দুটি ভ্যাকসিন দেওয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘সাতদিন পর হাসপাতাল থেকে সেলাই কেটে নিয়ে আসি। ওইদিন রাতেই তার জ্বর আসে। কয়েকদিন ওষুধ খাওয়ানোর পর ৩ মে আবার গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই। ওইদিনই বাড়িতে নিয়ে আসি। রাতে তার বমি হয়। এরপর ৬ মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে সেলাইন দেওয়া হয়। রাত আনুমানিক ৮টার দিকে হাসপাতালে মারা যান তিনি।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জমিলা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামীর উপার্জনে সংসার চলত। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। আরেক মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত। এখন কীভাবে সংসার চলবে, চিন্তায় আছি।’
ভ্যাকসিন দেওয়ার পরও কেন মৃত্যুর ঘটনা ঘটল জানতে চাইলে গাইবান্ধার সিভিল সার্জন মো. রফিকুজ্জামান বলেন, কুকুর কামড়ানোর পর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থান সাবান দিয়ে অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধুতে হয়। পাশাপাশি দ্রুত র্যাবিস ভ্যাকসিন ও র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন (আরআইজি) নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। এ ছাড়া ভ্যাকসিনের কোল্ড চেইন ঠিকভাবে সংরক্ষণ না হলেও কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তারা দোকান থেকে ভ্যাকসিন কিনেছেন, সেখানে ভ্যাকসিনের তাপমাত্রা হয়ত নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়নি। অর্থাৎ ভ্যাকসিনের কোল্ড চেইন মেইনটেইন করা হয়নি।
তিনি আরও জানান, যারা মারা গেছেন তাদের অধিকাংশের মুখমণ্ডলে কামড় ছিল। ফলে ভাইরাস দ্রুত স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে গেছে। এসব কোনো একটি কারণে তারা মারা যেয়ে থাকতে পারেন।
তিনি জানান, বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে এবং সুন্দরগঞ্জে স্বাস্থ্য বিভাগের সাত সদস্যের একটি টিম কাজ করছে।
কেমন আছেন আহতরা?
আহতদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। আহত স্কুলছাত্রী লিমো আক্তার (১১) জানায়, স্কুলে যাওয়ার পথে কুকুর তার মুখ ও গলায় কামড় দেয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন নেওয়ার পর সে এখন কিছুটা সুস্থ রয়েছে।
কুকুরের কামড়ে আহত বজরা কঞ্চিবাড়ি গ্রামের মিতু আকতার (১৬) বলেন, ‘বাড়ির উঠানে হঠাৎ একটি কুকুর এসে আমার হাতে কামড় দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে আমি হাসপাতালে গিয়ে ভ্যাকসিন নিয়েছি। এখন মোটামুটি সুস্থ আছি।’
একই গ্রামের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী লাবণ্য আকতার (১১)। স্কুলে যাওয়ার সময় কুকুর তার মুখমণ্ডলে কামড় দেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে গাইবান্ধা জেলারেল হাসপাতালে নিয়ে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। হাসপাতালে ছয় দিন চিকিৎসা শেষে সে বাড়িতে ফেরে। এখন সে কিছুটা ভালো আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বাজার, রাস্তা ও আবাসিক এলাকায় অবাধে ঘুরে বেড়ানো কুকুরের আক্রমণের শিকার হচ্ছে মানুষ।
এ সব বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোজাম্মেল হক বলেন, গত তিন বছরে উপজেলায় বেওয়ারিশ কুকুরের টিকা বরাদ্দ আসেনি। তবে পোষা কুকুরের জন্য সীমিত পরিমাণ ভ্যাকসিন পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, মানুষের চেয়ে কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়া সাশ্রয়ী। কারণ মানুষের ভ্যাকসসিনের দাম অনেক বেশি। সব কুকুরকে ভ্যাকসিন দিতে পারলে জলাতঙ্ক রোধ হবে।
সরকারি পদক্ষেপ
গাইবান্ধা জেলায় গত শনিবার ভোররাত থেকে কুকুরকে ভ্যাকসিন (রেবিস কিল) দেওয়া শুরু করা হয়েছে। প্রথম দিন গাইবান্ধা জেলা শহরে কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়।
গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য শুক্রবার সন্ধ্যায় সিরাজগঞ্জ থেকে ১৮ সদস্যের একটি টিম গাইবান্ধায় এসেছে। প্রাথমিকভাবে জেলায় চার থেকে পাঁচ হাজার কুকুরকে ভ্যাকসিন দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।’
এদিকে কুকুরের কামড়ে মারা যাওয়া সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পাঁচজনের প্রতি পরিবারকে সরকারিভাবে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের প্রতি পরিবারকে ১৫ হাজার করে টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।
গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারকে এবং আক্রান্তদের সহায়তা করা অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসন থেকে সার্বিক বিষয় তদারকি করা হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, গত ২২ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ও পাশের ছাপড়হাটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় একটি বেওয়ারিশ কুকুর নারী-শিশুসহ অন্তত ১৪ জনকে কামড়ে আহত করে। পরে আক্রান্তদের সবাইকে ভ্যাকসিন দেওয়া হলেও এর মধ্যে পাঁচজন মারা যান।


