সরকারি সতর্কতা ও মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগের ভেতরেই দেশে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা ঘটছেই। কিছুতেই যেন থামানো যাচ্ছে না এই প্রাণঘাতি ‘মব ভায়োলেন্স’।
মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, আইনের শাসন কার্যকর না হওয়ায় জনমনে ‘প্রতিশোধস্পৃহা’ উসকে ওঠাই এর কারণ। কয়েকটি ঘটনায় পুলিশ সদস্যরাও গণপিটুনির শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের পরিচালক নাসির উদ্দিন এলান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘গত বছরের ৫ আগস্টে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর থেকে পুলিশের সক্ষমতা কমেছে, বারবার হামলার ঘটনায় তাদের মনোবল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
‘যদি পুলিশ মনোবল ফিরে পায় এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, গণপিটুনি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে,’ যোগ করেন তিনি।
নাসির উদ্দিন জানান, কেউ কেউ ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে উত্তেজিত জনতাকে ব্যবহার করছে, এমন নজিরও রয়েছে।
তিনি শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ ও জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
চলতি আগস্টেই প্রথম ১১ দিনে সারাদেশে অন্তত ১৪টি গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০ জন, ১৩ জন হয়েছেন আহত।
বুধবার ঢাকার মিরপুরে লিখন হোসেন নামে ২৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়। ৯ আগস্ট রংপুরের তারাগঞ্জে চুরির অভিযোগে শ্বশুরপক্ষের রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাসকে হত্যা করা হয়, যা তাদের পরিবার অস্বীকার করেছে। একই দিনে মাদারীপুরে তিনজনকে চোর সন্দেহে মারধর করা হয়, যাদের মধ্যে একজনের চোখ নষ্ট হতে বসেছে।
আগস্টের প্রথম ১১ দিনে সংঘটিত আটটি গণপিটুনির ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অধিকাংশ থেকেই আনা হয়েছে চুরির অভিযোগ। আর বাকি ঘটনাগুলো চাঁদাবাজি, পূর্ব শত্রুতা ও পরিকল্পিত বিরোধ থেকে হয়েছে।
আগের মাসে, জুলাইয়েই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী দাবি করেছিলেন, গণপিটুনি কমেছে। একই সঙ্গে তিনি জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
কিন্তু আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১১১ জন; যার মধ্যে ঢাকার ৪৫, চট্টগ্রামের ১৭ ও বরিশালের ১১ জন রয়েছে।
এ বছরের ২২ মে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অফিসারদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ‘গণপিটুনি বরদাশত করা হবে না’ বলে সতর্ক করে ‘কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার’ হুঁশিয়ারি দেন।
তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যৌথবাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও গণপিটুনি রোধে মাঠপর্যায়ে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ ও ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, ‘আইনের শাসনের অনুপস্থিতির সুযোগে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে গণপিটুনি।’
‘সরকার অনেক কথা বললেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না,’ বলেন তিনি।
অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, ‘কোনো অপরাধীকেই জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়নি। মানবাধিকার সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১৪১টি ঘটনায় ৬৭ জন নিহত ও ১১৯ জন আহত হয়েছেন।’
২০১৫ সাল থেকে অন্তত এক হাজার ৯টি গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হন ৮১৬ জন, যার মধ্যে ২০২৪ সালকে গত এক দশকের ‘সবচেয়ে উদ্বেগজনক’ বছর হিসেবে বর্ণনা করেছে সংস্থাটি।
পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, ‘শুধু পুলিশ একা গণপিটুনি থামাতে পারবে না, এজন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।’
তিনি জানান, গত এপ্রিল মাসে ৩৭ বার ও মার্চে ৩৫ বার পুলিশকে লক্ষ্য করে জনতা হামলা চালিয়েছে।
মানবাধিকার কালচার ফাউন্ডেশনের (এমএইচসিএফ) তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭৮ জন এবং আগস্টের প্রথম ১০ দিনে আরও নয়জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন ২৬৬ জন, যার মধ্যে জুলাই মাসেই আহত হন ৫৩ জন।


