সংসারের অভাব দূর করতে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন কুমিল্লার চান্দিনার তরুণ মো. সাগর আবদুল্লাহ। সেখানে একটি বেকারিতে কাজ করে মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা আয় করতেন তিনি। কিন্তু বেশি আয়ের প্রলোভনে এক বাংলাদেশি দালালের মাধ্যমে জড়িয়ে পড়েন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে। সেই যুদ্ধে প্রাণ হারান সাগর। মৃত্যুর চার-পাঁচ মাস পর গত শনিবার এক সহযোদ্ধার ফোনে ছেলের মৃত্যুর খবর পান তার বাবা-মা। এখন ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চাইছেন তারা।
সাগরের বাড়ি চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকায়। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন তিনি। ছেলের আয়ে সংসারের অভাব দূর হবে, অসুস্থ বাবার চিকিৎসা হবে— এমন স্বপ্ন দেখেছিল পরিবার। ছেলের মৃত্যুতে সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে।
সাগরের বাবা কবীর হোসেন একসময় রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। সড়ক দুর্ঘটনায় অসুস্থ হওয়ার পর আর কাজ করতে পারেন না। এর মধ্যে তার শরীরে ক্যানসার ধরা পড়েছে। স্বামীর চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতে সাগরের মা দেলোয়ারা বেগম স্থানীয় একটি কারখানায় শ্রমিকের কাজ করেন।
পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের আশায় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি ধারদেনা করে প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ করে সাগরকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে বেকারিতে কাজ করার সময় এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ওই দালাল রুশ সেনাবাহিনীতে চাকরির প্রলোভন দেখান। পরিবারের নিষেধ উপেক্ষা করে চলতি বছরের মে মাসে যুদ্ধে যোগ দেন সাগর। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
চার-পাঁচ মাস ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছিলেন বাবা-মা। অবশেষে গত শনিবার এক সহযোদ্ধার ফোনে ছেলের মৃত্যুর খবর পান তারা। এরপর থেকে শোকে ভেঙে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
সাগরের এক বোন বলেন, পরিবারের অভাব দূর করতে বিদেশে গিয়েছিলেন তার ভাই। তাকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল। এখন ভাইয়ের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো দেখতে চান তারা। এ জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
ছেলের ছবি হাতে নিয়ে দিনরাত কাঁদছেন মা দেলোয়ারা বেগম। বারবার মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকেন, যদি ছেলের ফোন আসে, আরেকবার ‘মা’ বলে ডাকে। অন্যদিকে, ছেলেকে হারিয়ে শোকাহত বাবা কবীর হোসেনও তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
সাগরের প্রতিবেশীরা এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বিদেশে কাজের আশায় গিয়ে আর কোনো তরুণ যেন এমন প্রতারণার শিকার না হন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
সাগর কীভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, কোন দালালের মাধ্যমে যুদ্ধে গিয়েছিলেন এবং তার মরদেহ দেশে ফেরানো সম্ভব কি না, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পায়নি পরিবার।
চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, সংবাদমাধ্যমে খবরটি জানার পর তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে প্রশাসনিকভাবে সহযোগিতার উদ্যোগ নেবেন।


