দেশে নতুন সরকার গঠনের পর আলোচনায় থাকতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৌশল দলটির নেতাকর্মীদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দলীয় প্রধানের সরকারবিরোধী ধারাবাহিক বক্তব্য তাদেরকে বিপদে ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন দেশে অবস্থানরত নেতাকর্মীরা।
নানাভাবে বিপদে থাকা দলটির এসব নেতাকর্মীর ভাবনা, শেখ হাসিনার বক্তব্যের কারণে নতুন সরকার কঠোর মনোভাব পোষণ করলে তাদের এলাকায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিএনপি সরকার গঠন পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের পর শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে থেকে ধারাবাহিকভাবে নির্বাচন ও সরকারকে নিয়ে বিতর্ক তুলে আলোচনার কেন্দ্রে আসার চেষ্টা করছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর দিলারা চৌধুরীর মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনার বক্তব্যের কোনো রাজনৈতিক প্রভাব নেই, বরং তার এই অবস্থান দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য নতুন করে চাপ তৈরি করছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীরা এমনিতেই নানা আইনি ও প্রশাসনিক চাপে রয়েছেন, তার ওপর শীর্ষ নেতৃত্বের কঠোর বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তিনি বলেন, এটি মূলত নিজেকে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার কৌশল। একদিকে, তিনি দেশ-বিদেশে আলোচনায় থাকতে চান। অন্যদিকে, তার নেতৃত্ব নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে, তখন কর্মীদের মাঝে তার উপস্থিতি রাখতে চান। কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় এর মূল্য দেবেন সাধারণ কর্মীরাই।
বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে শেখ হাসিনা নানা বক্তব্য দিলেও সে বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের পাল্টা বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকা দলটির রাজনৈতিক পরিপক্কতা বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
‘স্পেস’ থেকে ‘সংকোচন’
বিএনপি সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, রাজনীতিতে ফেরার একটি ‘স্পেস’ তৈরি হবে। সেই আশাবাদ এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। যার পেছনে রয়েছে, সরকারের কঠোর অবস্থান, বিরোধী জোটের জামায়াত-এনসিপি) মারমুখী মনোভাব।
গত বুধবার বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ করে দলটির মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আওয়ামী লীগের বিষয়ে দলের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার আওয়ামী লীগের ওপরে থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে না।’
মাঠের বাস্তবতা
বিএনপি সরকার গঠনের পর কিছু এলাকায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খুললেও তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আবার বন্ধ হয়ে গেছে। কার্যক্রম চালানোর অভিযোগে বিভিন্ন স্থানে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার, জিরোপয়েন্ট থেকে টুঙ্গীপাড়া পর্যন্ত শোভাযাত্রার চেষ্টায় ঢাবি অধ্যাপক জামাল উদ্দিনের আটকের ঘটনায় স্পষ্ট, প্রশাসন এখনো কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এমনকি দলটির নেতাকর্মীদের জামিন পাওয়ার পরও ‘শোন অ্যারেস্ট’ এর মতো পদক্ষেপ দলীয় নেতাদের মধ্যে নতুন করে ভীতির সঞ্চার হয়েছে।
সংসদ ও রাজনীতির বার্তা
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দুই কার্য দিবসে সরকারি ও বিরোধী দল উভয় পক্ষ থেকেই আওয়ামী লীগ আমলের ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ উঠে এসেছে। এতে স্পষ্ট, দলটিকে ঘিরে তাদের কঠোর অবস্থানের কোনো বড় মতভেদ নেই। ওই আলোচনায় স্পষ্ট, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুযোগ তারা দেখতে চান না।
নেতৃত্বে পরিবর্তন চায় তৃণমূল
ক্ষমতার শেষ দিন পর্যন্ত গুম, খুন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্তদের নেতৃত্বে রাখার প্রশ্নে দলের ভেতরেই বিভক্তি তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের একটি বড় অংশ ‘ক্লিন ইমেজ’ নেতৃত্বের দাবি তুলেছেন। খোদ শেখ হাসিনার নেতৃত্ব পরিবর্তন করে দেশে অবস্থানকারী নেতাদেরকে নিয়ে নতুন নেতৃত্ব চান তারা। তবে, শীর্ষ পর্যায়ে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে গত বুধবার টাইমস অব বাংলাদেশের বিশেষ রিপোর্টে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভাবনাও উঠে আসে।
শেখ হাসিনার কৌশল
সরকার গঠন করার পর সার্বিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যকে অনেকেই দ্বিমুখী কৌশল হিসেবে দেখছেন। একদিকে, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আলোচনায় নিজের উপস্থিতি অন্যদিকে কর্মীদের মাঝে তার প্রভাব বজায় রাখতে চাইছেন তিনি।
দলীয় সূত্র বলছে, তাকে রেখেই নেতৃত্বে পরিবর্তনের চিন্তা চলছে। দলের শীর্ষ নেতারা শেখ হাসিনাকে বাদ রেখে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে চাইছেন না। যার প্রমাণ মিলেছে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর পালিয়ে বিদেশে অবস্থান করা দলটির একাধিক শীর্ষ নেতার কথায়।
তিন দিন আগে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম টাইমসকে বলেন, শেখ হাসিনাকে বাদ রেখে আওয়ামী লীগ রিফাইন্ড হবে এমন ভাবনা দলটির কর্মী সমর্থকদের মাঝে নেই। শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই দল পুনর্গঠন হতে পারে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেছেন, তারা আশা করেছিলেন নতুন সরকার গণতান্ত্রিক পথে হাঁটবে। কিন্তু বাস্তবে তার দেখা মিলছে না। সেই জায়গা থেকে শেখ হাসিনা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন।
তৃণমূল থেকে শুরু করে সাধারণ নেতাকর্মীর প্রত্যাশা, কঠিন বিপদে ফেলে রেখে বিদেশে আরাম-আয়েশি জীবনযাপন করা শীর্ষ নেতারা এমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না, যাতে কর্মীরা ফের বিপদে পড়েন।


