কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাঁচাতে সম্পূর্ণ এবং আংশিক বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কার্যকরী মূলধনের সংকটে থাকা বড় শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো এ তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে।
তবে দেশের ব্যাংকিং খাত যখন খেলাপি ঋণের বিশাল বোঝা বহন করছে এবং অব্যহত নীতি সহায়তার পরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে, তখন উৎপাদন পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ ব্যাংক খাতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা ‘বিআরপিডি সার্কুলার নং-১৩’ অনুযায়ী ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ নামে তিন বছর মেয়াদি পুনঃচলমান এই তহবিল গঠন করা হয়েছে।এই তহবিলে অর্থের উৎস হবে তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাবে, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৩ দশমিক ৭৮ লাখ কোটি উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে যার মধ্যে এখনি ব্যবহারযোগ্য তারল্য রয়েছে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, দেশের বহু শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যকরী মূলধনের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন বা সেবা দিতে পারছে না। এসব প্রতিষ্ঠানে নতুন অর্থায়ন সরবরাহ করা গেলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয় বাড়বে। এক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে রপ্তানিমুখী ও পরোক্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগ এমন সময়ে এলো যখন ব্যাংকগুলোর হাতে বিপুল তারল্য থাকলেও ঋণপ্রবাহ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। চলতি বছরে মার্চের শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের মধ্যে একটি।
একই সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এই পরিস্থিতি একটি অস্বাভাবিক বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
ব্যাংকগুলোর কাছে অর্থ রয়েছে। কিন্তু উচ্চ খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি এবং ঝুঁকিভীতির কারণে সেই অর্থ উৎপাদনমুখী খাতে প্রবাহিত হচ্ছে না।
অন্যদিকে, শিল্প খাতের একটি অংশ কার্যকরী মূলধনের সংকটে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন স্কিমটি মূলত সেই অচলাবস্থা ভাঙার চেষ্টা।
কারা পাবে, কীভাবে পাবে
জাতীয় শিল্পনীতিতে সংজ্ঞায়িত বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এই স্কিমের আওতায় অর্থায়নের জন্য বিবেচিত হবে। সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান, অথবা কার্যকরী মূলধনের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হতে না পারা প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে।
কারিগরি দক্ষতা ও ব্যবসায়িক সক্ষমতা রয়েছে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান যদি, বন্ধ শিল্প অধিগ্রহণ বা ইজারা নিয়ে পুনরায় চালু করতে চায়, তারাও অগ্রাধিকার পাবে।
তবে সিআইবিতে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত ঋণগ্রহীতা, অর্থপাচার বা ঋণের অর্থ অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান এবং একই উদ্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য কোনো পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান এ স্কিমের জন্য যোগ্য হবে না।
আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে হবে না। তারা তাদের বিদ্যমান ব্যাংকের কাছে কার্যকরী মূলধনের জন্য আবেদন করবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা, বন্ধ হওয়ার কারণ, মূলধনের প্রয়োজন, ব্যবসা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা এবং ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই করে বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ করা যাবে।
একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন পাবে। প্রতিটি ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর। সন্তোষজনক ব্যবসায়িক কার্যক্রম থাকলে তা নবায়নের সুযোগ থাকবে।
ঋণের অর্থ শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, কাঁচামাল ক্রয়, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং উৎপাদন ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে। বিদ্যমান ঋণ পরিশোধে এ অর্থ ব্যবহার নিষিদ্ধ।
স্কিমটির আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংক অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে ৪ শতাংশ সুদে টাকা দেবে। গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করা যাবে এবং প্রথম ছয় মাস থাকবে গ্রেস পিরিয়ড।
বর্তমানে বাজারে শিল্প ঋণের সুদহার ১৩ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যে থাকায় এই সুবিধা উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য যতটা স্পষ্ট, স্কিমটির ঝুঁকিও ততটাই স্পষ্ট। সার্কুলারে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের জন্য কোনো ন্যূনতম আর্থিক স্বাস্থ্যমান নির্ধারণ করা হয়নি। একই সঙ্গে একটি বিশেষ বিধানের আওতায় নির্দিষ্ট শর্তে রাইট-অফ ঋণ রয়েছে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানও নতুন অর্থায়নের সুযোগ পেতে পারে। ফলে উৎপাদন পুনরুদ্ধারের উদ্যোগটি ভবিষ্যতে নতুন খেলাপি ঋণ সৃষ্টি করবে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য একাধিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রেখেছে। শ্রমিকদের বেতন সরাসরি জাতীয় পরিচয় পত্র বা এনআইডি যাচাইকৃত ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবা হিসাবে পাঠাতে হবে, কোনো নগদ লেনদেন করা যাবে না। সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত বিক্রয় ও রাজস্ব তথ্য দিতে হবে।
অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কারখানা পরিদর্শন করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যেকোনো সময় সরেজমিনে যাচাই করতে পারবে।
ফলে স্কিমটির সাফল্য শুধু অর্থ বিতরণের ওপর নির্ভর করবে না, বরং কারা অর্থ পায়, অর্থ কীভাবে ব্যবহার হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক কতটা কঠোরভাবে তদারকি করতে পারে তার ওপর নির্ভর করবে।
বন্ধ শিল্প পুনরুদ্ধারের এই উদ্যোগ কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে নতুন গতি আনতে পারে, আবার দুর্বল বাস্তবায়ন হলে এটি ব্যাংকিং খাতের জন্য নতুন ঝুঁকির উৎসও হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।


