এখন মরদেহের অবশিষ্টাংশই ওদের প্রতিবেশী। ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংসস্তূপে রূপ নেওয়া বাড়িঘরে ফিরতে না পেরে কবরস্থানে ঘর বেঁধেছেন বাস্তুচ্যুত গাজাবাসী। কবরগুলোর ফলক হয়ে উঠেছে তাদের চেয়ার টেবিল এবং ঘুমানোর বিছানা।
বার্তা সংস্থা এপি’র প্রতিবেদনে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যের দেখা মিলেছে গাজার দক্ষিণের খান ইউনিসের একটি কবরস্থানে। লাখো শরণার্থীর ভীড়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ঠাঁই হয়নি বাস্তুচ্যুত প্রায় ৩০ ফিলিস্তিনি পরিবারের। ইসরায়েলি হামলা থেকে ছোট্ট সন্তানদের প্রাণ বাঁচাতে পরিবারগুলো তাঁবু গেড়েছে এখানে। একেকটি কবরের মাঝের খালি জায়গাগুলোতেই কাটাচ্ছেন দিন।
অবশ্য তাদের কারণে নীরব কবরস্থানেও এখন জীবনের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। কোথাও ঝুলছে নামাজের চাদর,কোথাও ধোঁয়া উঠছে রান্নার আগুনের। আশ্রয় নেওয়া পরিবারের ছোট শিশুরা দিব্যি খেলা করছে কবরের উপর বসেই। সেখানে খাবার খাচ্ছে আবার ঘুমিয়ে পড়ছে।
এমনই এক অসহায় পরিবারের কর্ত্রী মাইসা ব্রিকাহ। তিনি জানান, সন্তানদের নিয়ে গত পাঁচ মাস ধরে ধুলোয় ভরা কবরস্থানে বাস করছেন। রোদে পোড়া কবরের ফলকে বসে সাথীদের সঙ্গে খেলায় মশগুল তার স্বর্ণকেশী ছোট্ট মেয়ে।

মাইসা জানালেন, দিনের আলোয় শিশুরা কবরকেই সঙ্গী করে নেয়। কিন্তু রাতের অন্ধকার নামলেই পরিস্থিতি একেবারে আলাদা। তিনি বলেন, ‘সূর্য ডোবার পর শিশুরা ভয় পায়। ইসরায়েলি হামলার ভয় যেমন আছে, কবরকেও শিশুরা ভয় পায়, বাইরে যেতে চায় না। সঙ্গে যোগ হয় কুকুরের ভয়। আমার চার সন্তান। ইসরায়েলি বোমার শব্দের থেকে কুকুর আর মৃতদের ভয় তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়।’
ব্রিকাহ পরিবারের প্রতিবেশী কবরটি আহমদ আবু সাঈদের। ১৯৯১ সালের ওই কবরফলকে কোরআনের আয়াত খোদাই করা। সে বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন মাইসা। আপ্লুত কণ্ঠে জানান, এখানে বাস করতে অস্বস্তি হয়, মনে হয় মৃতদের অসম্মান করা হচ্ছে। কিন্তু বিকল্প কিছু নেই। খান ইউনিসে তাদের বিলাসবহুল বাড়ি এখন ধ্বংসস্তূপ। যে পাড়ায় তাদের ঘর ছিল সেটিও এখন ইসরায়েলি বাহিনীর দখলে। ওই এলাকায় ফিরে যাওয়া মানে হত্যাকারীর হাতে প্রাণ তুলে দেওয়া।
এখানে বসবাসরত অনেক শরণার্থী এসেছেন গাজার উত্তর দিক থেকে। এমনই একজন মোহাম্মদ শামাহ। তিন মাস ধরে তিনি কবরস্থানের ভেতর বাস করছেন। শামাহ বলেন, তার ঘরটিও ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে।
‘আমি প্রাপ্তবয়স্ক, তবুও রাতে কবরগুলো দেখে ভয় লাগে। আমি তখন তাঁবুর ভেতরে লুকিয়ে থাকি’, ভাঙ্গা এক কবরফলকের ওপর বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই যুদ্ধের কাছে নিজের অসহায়ত্ব তুলে ধরেন তিনি।
শামাহ জানান, যুদ্ধে ঘর হারিয়ে তার কাছে কেবল ২০০ শেকেল (প্রায় ৬০ ডলার) অবশিষ্ট ছিল। এই অর্থের বিনিময়েই তার এক বন্ধু পরিবারসহ তাকে এই কবরে তাঁবু গাড়তে সাহায্য করে।
অর্থের অভাবেই অনেক পরিবার কবরস্থানে থাকতে বাধ্য হচ্ছে বলে জানান মোহাম্মদের স্ত্রী হানান শামাহ। এপির প্রতিনিধিরা যখন তার তাঁবুতে যান তখন কুড়িয়ে পাওয়া টিনের খণ্ড দিয়ে তৈরি পাত্র পরিষ্কার করছিলেন হানান। একই পানি ব্যবহার করছিলেন অন্য পাত্র ধুতেও। আশেপাশে পানির কোনো উৎস না থাকায় অল্প পানিতে একাধিক কাজ করতে বাধ্য হন তারা।
হানান বলেন, ‘এখানে জীবন মানেই ভয়, উদ্বেগ আর অনিদ্রা। আমরা যে মানসিক চাপের মধ্যে আছি তা বর্ণনাতীত। মরদেহ ও কবরের সঙ্গে বেঁচে থাকার এমন শাস্তির পরও জীবনের নিশ্চয়তা নেই।’

জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থার মতে, ইসরায়েলি বাহিনী গত দুই বছরের এই যুদ্ধে একাধিকবার কবরস্থানে বোমা ফেলেছে। তাদের দাবি, হামাস সদস্যরা এসব জায়গাকে হামলায় “আড়াল হিসেবে” ব্যবহার করছে। এমনকি এখানে বসবাসরতরা ভূগর্ভস্থ টানেল খুঁড়েছে। সেখানে ইসরায়েলি জিম্মিদেরও আটকে রাখা হতে পারে। আর এ কারণেই কবরস্থানও সামরিক লক্ষ্যবস্তু হয়ে গেছে।
ফিলিস্তিনিরা সাধারণত প্রিয়জনের মরদেহ বাড়ির আশেপাশের কবরস্থানেই দাফন করে, যেন তারা নিয়মিত কবরের পরিচর্যা করতে পারে। তবে যুদ্ধ সেই প্রথা চুরমার করে দিয়েছে।
এসময় হাজারও মরদেহ বিভিন্ন হাসপাতালের আঙ্গিনায় দাফন করা হয়েছে। এখন যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর সেই দেহাবশেষগুলো খুঁজে কবরস্থানে দাফনের চেষ্টা করছেন তাদের পরিবার। একইসঙ্গে হামাসের কাছে জিম্মি ইসরায়েলি মরদেহগুলোর খোঁজেও কবর খুঁড়ছেন হামাস সদস্যরা।
অন্যদিকে ইসরায়েলি বাহিনীর ফিরিয়ে দেওয়া মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হলে খোঁড়া হচ্ছে নতুন কবর। এসব দেহাবশেষকে জায়গা দিতে ফের ঘর হারানোর শঙ্কায় ভুগছেন কবরস্থানে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুতরা।
মোহাম্মদ শামাহ বলেন, ‘প্রতিদিনই নিত্যনতুন মরদেহ কিংবা দেহাবশেষ কবরস্থানে আনা হচ্ছে। নতুন কবর খোঁড়া হচ্ছে। যেখানে আমরা ঘর বেঁধেছি, সেখানে আর কতদিন থাকতে পারব জানি না। এরপর যাওয়ার আর জায়গা নেই।’
যুদ্ধবিরতির পরেও জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী-সন্তানরা জীবিত হয়েও মৃতদের সঙ্গে থাকছে।’
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন গাজার ২০ লাখেরও বেশি মানুষ। এ যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৬৮ হাজার। চলমান যুদ্ধবিরতিতে নতুন করে উদ্ধার হওয়া শত শত মরদেহ যুক্ত হচ্ছে নিহতের তালিকায়।
যুদ্ধের পর প্রত্যাশিত পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন, প্রত্যাবর্তন-সবকিছুই যেন গ্রাস করে নিয়েছে কবরস্থানের এই নির্মমতা।


