ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার হোসনাবাদ ইউনিয়নের লালানগর গ্রামের সরু পথ ধরে একের পর এক ঢুকছিল অ্যাম্বুলেন্স। একে একে কফিনবন্দী হয়ে নামানো হয় চার সহোদরের মরদেহ।
মুহূর্তেই কফিন ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। পুরো গ্রাম স্তব্ধ হয়ে যায় নীরব শোকে। জীবিকার তাগিদে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে যাওয়া চার ভাই একসঙ্গে নিথর দেহ হয়ে ফিরবেন- এমন নির্মম পরিণতি কল্পনাও করেনি তাদের পরিবার।
নিহতরা হলেন রাঙ্গুনিয়ার চার প্রবাসী সহোদর- রাশেদ, সিরাজ, শহিদুল ও তাদের আরেক ভাই। গত বুধবার ওমানে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়। পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গাড়ির ভেতরে থাকা অবস্থায় এসি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুধবার বেলা ১১টার দিকে লালানগর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে চার ভাইয়ের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ঢল নামে হাজারও মানুষের। পরিবারে ও আত্মীয় স্বজনের পাশাপাশি আশপাশের গ্রাম ও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন সহোদরদের শেষ বিদায় জানাতে। অনেকের চোখে ছিল অশ্রু, কারও কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে তাদের মরদেহ দেশে পৌঁছায়। জানাজার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্ত ছিল ইমামতির সময়। নিহত চার ভাইয়ের একমাত্র জীবিত ছোট ভাই মাওলানা মো. এনাম জানাজা পড়ান। বড় চার ভাইয়ের কফিন সামনে রেখে বারবার তার কণ্ঠ ধরে আসে। কয়েকবার চোখ মুছতে দেখা যায় তাকে। উপস্থিত অনেকেই তখন কান্না ধরে রাখতে পারেননি।
জানাজায় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। স্থানীয়রাও স্বজন হারানোর এই বেদনায় শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ান।

পরিবারের সদস্যরা জানান, পাঁচ ভাইয়ের সংসারে এখন বেঁচে আছেন শুধু এনাম। বৃদ্ধা মা প্রথমে বুঝতেই পারেননি কী ঘটেছে। তাকে বলা হয়েছিল ছেলেরা অসুস্থ। পরে জানাজার আগে চার ছেলেকে একসঙ্গে দেখে তিনি আহাজারিতে ভেঙে পড়েন। তার কান্নায় আশপাশের মানুষের চোখও ভিজে ওঠে।
নিহতদের মধ্যে দুইজন বিবাহিত ও দুইজন অবিবাহিত ছিলেন। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন তারা। তাদের মৃত্যুতে পরিবারটি শুধু মানসিকভাবেই নয়, অর্থনৈতিকভাবেও বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে জানান স্বজনেরা।
জানাজা শেষে চারটি মরদেহ কাঁধে তুলে নেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ধীর পায়ে সবাই এগিয়ে যান স্থানীয় জামে মসজিদের পাশের পারিবারিক কবরস্থানের দিকে। সেখানে একই সারিতে চার ভাইকে দাফন করা হয়। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অনেকে অঝোরে কাঁদছিলেন।
স্থানীয়রা জানান, রাঙ্গুনিয়ায় একসঙ্গে একই পরিবারের চার ভাইয়ের মৃত্যু ও দাফনের এমন ঘটনা এর আগে কেউ দেখেননি।
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে যে পরিবারটি প্রিয়জনদের দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিল, সেই বাড়িতেই এখন শুধু শোকের মাতম। মরুভূমির দেশ থেকে চার ভাই ফিরেছেন ঠিকই, তবে জীবিত নয়- চারটি কফিন হয়ে। তাদের চলে যাওয়া লালানগর গ্রামের আকাশে রেখে গেছে দীর্ঘশ্বাসের ভারী নীরবতা।


