স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ আরও তিন বছর পিছিয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত নিতে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করেছে সরকার। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এই উত্তরণ ঘটার কথা ছিল। তবে সরকার সম্প্রতি জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তুতিকালীন সময় বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ওপর নির্ভর করছে। বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দ্রুত সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মসৃণ উত্তরণ কৌশলের আওতায় এ পর্যন্ত যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তা টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। বিশ্বমঞ্চে এই যুক্তিটিই এখন জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এই বাড়তি প্রস্তুতির দাবির পক্ষে একটি বড় যুক্তি হতে পারে। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। তাই একটি টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সময় চাওয়াটা যৌক্তিক। তিনি সময়মতো এই আবেদন করায় সরকারের প্রশংসা করেন।
তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, জাতিসংঘে সিডিপির পর্যালোচনা ও সুপারিশের পর সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। এই প্রক্রিয়ায় ভারত, চীন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অংশীদারদের সমর্থন পেতে দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা শুরুর তাগিদ দেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই এই আবেদন করা হয়। দ্রুত উত্তরণের ফলে দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে ব্যবসায়ী নেতারা যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, তার প্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘে পাঠানো চিঠিতে সরকার বিশ্বব্যাপী ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংকটের কথা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারীর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির অস্থিরতা। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথে বিঘ্ন ঘটার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আর্থিক খাতের নাজুক অবস্থার কথা বলা হয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, এই সংকটগুলো দেশের অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। এর ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়েছে এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ থমকে গেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ায় মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্প কাঁচামাল আমদানি কমে গেছে। এটি নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, সুশাসনের অভাব এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারকে দুর্বল করে দিয়েছে। গত কয়েক বছর নীতিনির্ধারকদের সব মনোযোগ ছিল স্বল্পমেয়াদী সংকট মোকাবিলা এবং খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে। এর ফলে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় বড় ধরনের সংস্কারমূলক কাজগুলো করা সম্ভব হয়নি।
উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য নিয়ে সরকার তার আশঙ্কার কথা স্পষ্ট করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের মতো চ্যালেঞ্জগুলো বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া প্রতিযোগী দেশগুলোর নতুন নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বর্তমান জ্বালানি সংকট ও অবকাঠামো সমস্যার কারণে শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এই অবস্থায় দ্রুত সুযোগ-সুবিধা চলে গেলে রপ্তানি আয় আরও কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশ যদিও এলডিসি থেকে বের হওয়ার সকল শর্ত পূরণ করেছে, তবে বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিতে পারেনি। পূর্বে এই প্রস্তুতিকালীন সময় ২০২৬ সাল পর্যন্ত ছিল, যা এখন ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে সরকার অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবে।
আবেদনের এই প্রক্রিয়াটি প্রথমে জাতিসংঘের সিডিপি পর্যালোচনা করবে। এরপর তাদের সুপারিশ ইকোসোক হয়ে সাধারণ পরিষদে যাবে। সেখানে সদস্য দেশগুলোর ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিভিন্ন বিদেশি মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানিয়েছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ও নেপালের সমর্থন আদায়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান ইকোসোক-এর সভাপতি নেপাল হওয়ায় দেশটির ভূমিকা এই প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।


