একদিনে পাহাড়-লেকের কাপ্তাই ভ্রমণ

একদিনে পাহাড়-লেকের কাপ্তাই ভ্রমণ
Advertisement
Advertisement

পাহাড়, অরণ্য আর টলটলে নীল জলরাশির মিতালি দেখতে চাইলে কাপ্তাইয়ের কোনো বিকল্প নেই। চট্টগ্রাম থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত এই জনপদটি এক দিনের ভ্রমণের জন্য এক স্বর্গীয় গন্তব্য। খুব সকালে বেরিয়ে সারাদিন প্রকৃতির অপার সান্নিধ্যে কাটিয়ে সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম শহরে ফিরে আসা যায় বলে এটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট কিংবা অক্সিজেন মোড় থেকে যাত্রা শুরু করলে মাত্র ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই কাপ্তাই উপজেলায় পৌঁছে যাওয়া যায়। পথের দুই পাশের সবুজ শ্যামল দৃশ্য আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা আপনার যাত্রার শুরুতেই এক অন্যরকম প্রশান্তি এনে দেবে।

কাপ্তাই পৌঁছানোর পর পর্যটকদের প্রথম গন্তব্য হওয়া উচিত কাপ্তাই জেটি ঘাট। এখান থেকেই শুরু হয় মূল রোমাঞ্চ। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ কাপ্তাই লেকের নীল জলরাশি চিরে নৌবিহারের অভিজ্ঞতা যেকোনো মানুষের মন ভালো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ভাড়া করে লেকের বিশালতায় হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ট্রলার ভাড়া সাধারণত দরদামের ওপর নির্ভর করে, তবে পুরো দিনের জন্য ৩০০০ থেকে ৪০০০ টাকার মধ্যে একটি মাঝারি ট্রলার রিজার্ভ করা সম্ভব।

কাপ্তাই লেকের মাঝ দিয়ে ট্রলারে করে রাঙামাটি শহরের দিকে যাত্রা করা যায়। দীর্ঘ এই নৌপথের দুই পাশে ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড় এবং পাহাড়ের গায়ে জুম চাষের দৃশ্য আপনার চোখে পড়বে। লেকের পানির ওপর ভেসে থাকা মাছ ধরার নৌকা এবং শান্ত শীতল বাতাস এক মোহময় পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই দীর্ঘ নৌভ্রমণের সময় আপনি যদি চান তবে রাঙামাটির সুবলং ঝর্ণা কিংবা ঝুলন্ত ব্রিজ পর্যন্ত ঘুরে আসতে পারেন। নৌপথের এই প্রশান্তি শহরের যান্ত্রিকতাকে ভুলিয়ে দেয় নিমিষেই।

জলজ রোমাঞ্চ শেষে কাপ্তাইয়ের অন্যতম দর্শনীয় স্থান পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্পিলওয়ে দেখা এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। প্রকৌশলবিদ্যার এই বিস্ময়কর অবকাঠামোটি কাপ্তাই ড্যাম নামেও পরিচিত। ৫৪টি বিশাল গেট দিয়ে যখন একসাথে পানি পড়ার দৃশ্য দেখা যায়, তখন সেই গর্জন আর জলীয় বাষ্পের কুয়াশা এক অদ্ভূত আবেশ তৈরি করে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পাশেই কর্ণফুলী নদীর শান্ত প্রবাহ প্রকৃতির রুদ্র আর শান্ত—এই দুই রূপকেই ফুটিয়ে তোলে।

আরও পড়ুন

বিকেলের দিকে ভ্রমণের তালিকায় যুক্ত করা যেতে পারে কাপ্তাই নৌবাহিনী পিকনিক স্পট লেক প্যারাডাইস। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং পরিকল্পিতভাবে সাজানো এই স্পটের প্রধান আকর্ষণ এর  চারদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্য। রয়েছে জাহাজের আদলে তৈরি ভিউ পয়েন্ট।

কাপ্তাইয়ের আরেকটি জনপ্রিয় গন্তব্য হলো বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর পরিচালনায় প্রশান্তি পার্ক। কাপ্তাই শহরে প্রবেশের আগেই কর্ণফুলী নদীর তীরে দৃষ্টি নন্দনভাবে সাজানো হয়েছে এই পিকনিক স্পট। চারদিকে অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার পাশাপাশি এখানকার রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজও সেরে নেওয়া যায়। কর্ণফুলী নদীতে করা যায় কায়াকিং।

কাপ্তাইয়ের আরেক আকর্ষণ কাপ্তাই-আসাম বস্তি-রাঙ্গামাটি সড়ক। এই সড়কটিকে বলা হয় বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর এবং বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি পথ। প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রাস্তার কোথাও দুই পাশে লেক, কোথাও একদিকে খাড়া পাহাড় আর অন্যদিকে লেকের বিশাল জলরাশি। আঁকাবাঁকা এই সর্পিল পথ দিয়ে গাড়ি চালানোর সময় মনে হবে আপনি কোনো বিদেশি ল্যান্ডস্কেপের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। রাস্তার মাঝে মাঝে থাকা গার্ডার ব্রিজগুলো এই সৌন্দর্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

কাপ্তাই-আসাম বস্তি-রাঙ্গামাটি সড়ক। ছবি: সংগৃহীত

এই রাস্তা ধরে রাঙ্গামাটি হয়ে সন্ধ্যার পর আবারও ফিরে আসতে পারেন চট্টগ্রাম। অথবা আসাম বস্তি সড়কের কিছুদূর ভ্রমণ শেষে এই পথে আবার কাপ্তাই হয়েও ফিরতে পারেন।

কাপ্তাই ভ্রমণের সময় জাতীয় উদ্যানে প্রবেশে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বন বিভাগের কর্মীদের সঙ্গে না নিয়ে কাপ্তাইয়ের পাহাড়ি বনে প্রবেশ করা উচিত নয়। কারণ এই বনে আছে বুনো হাতি, যা সামনে পড়ে গেলে জীবনের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।

একদিনের এই কাপ্তাই সফরে একদিকে যেমন পাহাড় আর হ্রদের বিশালতা দেখা যায়, তেমনি নৌবাহিনীর স্পট লেক প্যারাডাইস বা বিজিবি’র প্রশান্তি পার্কের মতো সাজানো গোছানো পরিবেশেও সময় কাটানো যায়। ঈদের ছুটিতে যান্ত্রিক শহরের একঘেয়েমি কাটিয়ে নিজেকে নতুন করে সজীব করে তুলতে চট্টগ্রামবাসীদের জন্য কাপ্তাই ভ্রমণ হতে পারে আজীবন মনে রাখার সুখস্মৃতি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad